বাংলা আরবি

بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ ﴿١﴾

পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ্‌র নামে শুরু করছি ( সুরাঃ আল-ফাতিহা আয়াতঃ 1 )

এই সূরাটির নাম ‘সূরা-ই-আল ফাতিহাহ্। কোন কিছু আরম্ভ করার নাম ‘ফাতিহাহ’ বা উদ্ঘাটিকা। কুরআন কারীমের মধ্যে প্রথম এই সূরাটি লিখিত হয়েছে বলে একে সূরা-ই-আল ফাতিহাহ্ বলা হয়। তাছাড়া নামাযের মধ্যে এর দ্বারাই কিরাআত আরম্ভ করা হয় বলেও একে এই নামে অভিহিত করা হয়েছে। উম্মুল কিতাব’ও এর অপর একটি নাম। জমহুর বা অধিকাংশ ইমামগণ এ মতই পোষণ করে থাকেন। কিন্তু হাসান বসরী (রঃ) এবং ইবনে সীরীন (রঃ) একথা স্বীকার করেন না। তাঁরা বলেন যে, ‘লাও-হি মাহফুয বা সুরক্ষিত ফলকের নামও উম্মুল কিতাব। হাসানের উক্তি এই যে, প্রকাশ্য আয়াতগুলোকে উম্মুল কিতাব বলা হয়। জামেউত তিরমিযীর একটি বিশুদ্ধ হাদীসে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ (আরবী) এই সূরাটি হলো উম্মুল কুরআন, উম্মুল কিতাব, সাবআ মাসানী এবং কুরআন আযীম'। এই সূরাটির নাম ‘সূরাতুল হামদ’ এবং সূরাতুস্ সালাত'ও বটে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন যে, আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “আমি সালাতকে (অর্থাৎ সূরা-ই-ফাতিহাকে আমার মধ্যে এবং আমার বান্দাদের মধ্যে অর্ধেক অর্ধেক করে ভাগ করে দিয়েছি। যখন বান্দা বলে (আরবী) তখন আল্লাহ বলেন, আমার বান্দা আমার প্রশংসা করেছে। এই হাদীস দ্বারা জানা যায় যে, সূরা-ই-ফাতিহার নাম সূরা- ই-সালাতও বটে। কেননা এই সূরাটি নামাযের মধ্যে পাঠ করা শর্ত রয়েছে। এই সূরার আর একটি নাম সূরাতুশ শিফা। দারিমীর মধ্যে হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) হতে মারফু রূপে বর্ণিত আছে যে, সূরা-ই-ফাতিহা প্রত্যেক বিষ ক্রিয়ায় আঁরেগ্যিদানকারী। এর আর একটি নাম সূরাতুর রকিয়্যাহ'। হযরত আবূ সাঈদ (রাঃ) সাপে কাটা রুগীর উপর ফু দিলে সে ভাল হয়ে যায়। এ দেখে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে জিজ্ঞেস করেছিলেনঃ এটা যে রকিয়্যাহ (অর্থাৎ পড়ে ফুঁ দেয়ার সূরা) তা তুমি কেমন করে জানলে?' হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এ সূরাকে আসাসুল কুরআন বলতেন। অর্থাৎ কুরআনের মূল বা ভিত্তি। আর এই সূরার ভিত্তি হলো (আরবী) সুফইয়ান বিন উয়াইনাহ (রঃ) বলেন যে, এই সূরার নাম অফিয়াহ্। ইয়াহ্ইয়া বিন কাসীর (রাঃ) বলেন যে, এর নাম কাফিয়াও বটে। কেননা, এটা অন্যান্য সূরাকে বাদ দিয়েও একাই যথেষ্ট হয়ে থাকে। কিন্তু অন্য কোন সূরা একে বাদ দিয়ে যথেষ্ট হয় না। কোন কোন মুরসাল (যে হাদীসের সনদের ইনকিতা' শেষের দিকে হয়েছে অর্থাৎ সাহাবীর নামই বাদ পড়েছে এবং তাবেঈ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নাম করে হাদীস বর্ণনা করেছেন তাকে হাদীসে’ মুরসাল বলে) হাদীসের মধ্যেও একথা এসেছে যে, উম্মুল কুরআন সবারই স্থলাভিষিক্ত হতে পারে, কিন্তু অন্যান্য সূরাগুলো উম্মুল কুরআনের স্থলাভিষিক্ত হতে পারে না। (আল্লামা যামাখশারীর তাফসীর-ই-কাশশাফ দ্রব্য) একে সূরাতুস সালাত এবং সূরাতুল কাজও বলা হয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), কাতাদাহ (রঃ) এবং আবুল আলিয়া (রঃ) বলেন যে, এই সূরাটি মাক্কী। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ), মুজাহিদ (রঃ), আতা’ বিন ইয়াসার (রঃ) এবং ইমাম যুহরী (রঃ) বলেন যে, এই সূরাটি মাদানী। এটাও একটি অভিমত যে, এই সূরাটি দুইবার অবতীর্ণ হয়েছে। একবার মক্কায় এবং অন্যবার মদীনায়। কিন্তু প্রথমটিই বেশী সঠিক ও অভ্রান্ত। কেননা অন্য আয়াতে আছে (আরবী) অর্থাৎ ‘আমি তোমাকে সাবআ মাসানী (বারবার আবৃত্ত সাতটি আয়াত) প্রদান করেছি'।' (১৫:৮৭) আল্লাহ তা'আলাই এ ব্যাপারে সবচেয়ে বেশী জানেন। আবু লাইস সমরকন্দীর (রঃ) একটি অভিমত কুরতুবী (রঃ) এও নকল করেছেন যে, এই সূরাটির প্রথম অর্ধাংশ মক্কায় অবতীর্ণ হয়েছে এবং শেষ অর্ধাংশ মদীনায় অবতীর্ণ হয়েছে। কিন্তু হাদীসের পরিভাষায় এই কথাটিও সম্পূর্ণ গারীব বা দুর্বল। এ সূরার আয়াত সম্পর্কে সবাই একমত যে ওগুলি ৭টা। কিন্তু আমর বিন উবায়েদ ৮টা এবং হুসাইন যফী ৬টাও বলেছেন। এ দুটো মতই সাধারণ মতের বহির্ভূত ও পরিপন্থী (আরবী) এই সূরাটির পৃথক আয়াত কিনা তাতে মতভেদ রয়েছে। সমস্ত কারী, সাহাবী (রাঃ) এবং তাবেঈর (রঃ) একটি বিরাট দল এবং পরবর্তী যুগের অনেক বয়োবৃদ্ধ মুরব্বী একে সূরা -ই-ফাতিহার প্রথম, পূর্ণ একটি পৃথক আয়াত বলে থাকেন। কেউ কেউ একে সূরা-ই-ফাতিহারই অংশ বিশেষ বলে মনে করেন। আর কেউ কেউ একে এর প্রথমে মানতে বা স্বীকার করতেই চান না। যেমন মদীনা শরীফের কারী ও ফকীহগণের এই তিনটিই অভিমত। ইনশাআল্লাহ পূর্ণ বিবরণ সামনে প্রদত্ত হবে। এই সূরাটির শব্দ হলো পঁচিশটি এবং অক্ষর হলো একশো তেরটি। ইমাম বুখারী (রঃ) সহীহ বুখারীর কিতাবুত তাফসীরের মধ্যে লিখেছেনঃ “এই সূরাটির নাম উম্মুল কিতাব' রাখার কারণ এই যে, কুরআন মাজীদের লিখন এ সূরা হতেই আরম্ভ হয়ে থাকে এবং নামাযের কিরআতও এ থেকেই শুরু হয়। একটি অভিমত এও আছে যে, যেহেতু পূর্ণ কুরআন কারীমের বিষয়াবলী সংক্ষিপ্তভাবে এর মধ্যে নিহিত রয়েছে, সেহেতু এর নাম উম্মুল কিতাব হয়েছে। কারণ, আরব দেশের মধ্যে এ প্রথা চালু আছে যে, তারা একটি ব্যাপক কাজ বা কাজের মূলকে ওর অধীনস্থ শাখাগুলির ‘উম্ম’ বা ‘মা’ বলে থাকে। যেমন (আরবী) তারা ঐ চামড়াকে বলে যা সম্পূর্ণ মাথাকে ঘিরে রয়েছে এবং সামরিক বাহিনীর পতাকাকেও তারা (আরবী) বলে থাকে যার নীচে জনগণ একত্রিত হয়। কবিদের কবিতার মধ্যেও একথার ভুরি ভুরি প্রমাণ পাওয়া যায়। মক্কা শরীফকেও উম্মুল কুরা বলার কারণ এই যে, ওটাই সারা বিশ্ব জাহানের প্রথম ঘর। পৃথিবী সেখান হতেই ব্যাপ্তি ও বিস্তার লাভ করেছে। নামাযের কিরআত ওটা হতেই শুরু হয় এবং সাহাবীগণ কুরআন কারীম লিখার সময় একেই প্রথমে লিখেছিলেন বলে একে ফাতিহাও বলা হয়। এর আর একটি সঠিক নাম ‘সাবআ মাসানীও রয়েছে, কেননা এটা নামাযের মধ্যে বারবার পঠিত হয়। একে প্রতি রাকাতেই পাঠ করা হয়। মাসানীর অর্থ আরও আছে যা ইনশাআল্লাহ যথাস্থানে বর্ণিত হবে। মুসনাদে-ই-আহমাদের মধ্যে হযরত আবু হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) উম্মুল কুরা' সম্পর্কে বলেছেনঃ 'এটাই উম্মুল কুরআন এটাই সাবআ মাসানী এবং এটাই কুরআনে আযীম। অন্য একটি হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘এটাই ‘উম্মুল কুরআন, এটাই 'ফাতিহাতুল কিতাব’ এবং এটাই সাবআ মাসানী। তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াইতে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ (আরবী)-এর সাতটি আয়াত। (আরবী) ও ওগুলোর মধ্যে একটি আয়াত। এরই নাম সাবআ মাসানী’, এটাই, কুরআনে আযীম, এটাই ‘উম্মুল কিতাব, এটাই ‘ফাতিহাতুল কিতাব’ এবং এটাই কুরআনে আযীম। ইমাম দারকুতনীও (রঃ) স্বীয় হাদীস গ্রন্থে এরূপ একটি হাদীস এনেছেন এবং তিনি তার সমস্ত বর্ণনাকারীদেরই নির্ভরযোগ্য বলেছেন। বায়হাকীতে রয়েছে যে, হযরত আলী (রাঃ), হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এবং হযরত আবু হুরায়রাহ (রাঃ) সাবআ মাসানী’র ব্যাখ্যায় বলেছেনঃ ‘এটা সূরা-ই-ফাতিহা এবং -এর সপ্তম আয়াত। (আরবী)-এর আলোচনায় (আরবী)-এর বর্ণনা পূর্ণভাবে দেওয়া হবে। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ)কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিলঃ আপনার লিখিত কুরআন কারীমের প্রারম্ভে আপনি সূরা-ই-ফাতিহা লিখেননি কেন? তিনি উত্তরে বলেছিলেনঃ যদি আমি লিখতাম তবে প্রত্যেক সূরারই প্রথমে ওটাকে লিখতাম। আবু বকর বিন আবি দাউদ (রঃ) বলেনঃ একথার ভাবার্থ এই যে, . নামাযের মধ্যে তা পাঠ করা হয় এবং সমস্ত মুসলমানের এটা মুখস্থ আছে বলে তা’ লিখার আর প্রয়োজন হয় না। দালাইলুন নবুওয়াত’ এ ইমাম বায়হাকী (রঃ) একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন। তাতে রয়েছে যে, এই সুরাটি সর্বপ্রথম অবর্তীণ হয়েছে। বাকিলানীর (রঃ) তিনটি উক্তি বর্ণিত হয়েছেঃ (১) সূরা-ই-ফাতিহা সর্বপ্রথম অবতীর্ণ হয়েছে। (২) (আরবী) সর্বপ্রথম অবতীর্ণ হয়েছে। (৩) (আরবী) সর্বপ্রথম অবতীর্ণ হয়েছে। শেষ উক্তিটিই সঠিক। এর পূর্ণ বিবরণ ইনশাআল্লাহ যথাস্থানে আসবে। সূরা-ই-ফাতিহার ফযীলত ও মাহাত্ম্যঃ মুসনাদ-ই-আহমাদে হযরত আবু সাইদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ “আমি নামায পড়ছিলাম, এমন সময়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে ডাক দিলেন, আমি কোন উত্তর দিলাম না। নামায শেষ করে আমি তাঁর নিকট উপস্থিত হলাম। তিনি আমাকে বললেনঃ এতক্ষণ তুমি কি কাজ করছিলে? আমি বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি নামাযে ছিলাম। তিনি বললেনঃ আল্লাহ তা'আলার এই নির্দেশ কি তুমি শুননি? (আরবী) অর্থাৎ “হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের (সঃ) ডাকে সাড়া দাও যখন তাঁরা তোমাদেরকে আহ্বান করেন। (৮:২৪) জেনে রেখো, মসজিদ হতে যাবার পূর্বেই আমি তোমাদেরকেই বলে দিচ্ছি, পবিত্র কুরআনের মধ্যে সবচেয়ে বড় সূরা কোটি। অতঃপর তিনি আমার হাত ধরে মসজিদ হতে চলে যাবার ইচ্ছে করলে আমি তাকে তার অঙ্গীকারের কথা স্মরণ করিয়ে দিলাম। তিনি বললেনঃ ‘ঐ সূরাটি হলো (আরবী) এটাই সাবআ’ মাসানী এবং এটাই কুরআন আযীম যা আমাকে দেয়া হয়েছে। এভাবেই এই বর্ণনাটি সহীহ বুখারী শরীফ, সুনান-ই আবি দাউদ এবং সুনান-ই-ইবনে মাজার মধ্যেও অন্য সনদে বর্ণিত হয়েছে। ওয়াকেদী (রঃ) এই ঘটনাটি হযরত উবাই ইবনে কা'বের (রাঃ) বলে বর্ণনা করেছেন। মুআত্তা-ই-ইমাম মালিকে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত উবাই ইবনে কা'ব (রাঃ) কে ডাক দিলেন। তিনি নামায পড়ছিলেন। নামায শেষ করে তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সঙ্গে সাক্ষাত করেন। তিনি বলেনঃ তিনি (নবী সঃ) স্বীয় হাতখানা আমার হাতের উপর রাখলেন। মসজিদ হতে বের হতে হতেই বললেনঃ আমি চাচ্ছি যে, মসজিদ হতে বের হওয়ার পূর্বেই তোমাকে এমন একটি সূরার কথা বলবো যার মত সূরা তাওরাত, ইঞ্জীল ও কুরআনে নেই। এখন আমি এই আশায় আস্তে আস্তে চলতে লাগলাম এবং জিজ্ঞেস করলাম-“হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! সেই সূরাটি কি? তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ নামাযের প্রারম্ভে তোমরা কি পাঠ কর?' আমি বললাম (আরবী) তিনি বললেনঃ “এই সূরা সেটি। সাবআ’ মাসানী এবং কুরআন আযীম যা আমাকে দেয়া হয়েছে তাও এই সূৱাই বটে। এই হাদীসটির শেষ বর্ণনাকারী হলেন আবু সাঈদ (রঃ)। এর উপর ভিত্তি করে ইবনে আসীর এবং তাঁর সঙ্গীগণ প্রতারিত হয়েছেন এবং তাঁকে আবু সাঈদ বিন মুআল্লা মনে করেছেন। এ আবু সাঈদ অন্য লোক, ইনি খাসাইর কৃতদাস এবং তাবেঈগণের অন্তর্ভুক্ত। আর উক্ত আবু সাঈদ আনসারী (রাঃ) একজন সাহাবী। তার হাদীস মুত্তাসিল (যে হাদীসের সনদের মধ্যে কোন স্তরে কোন রাবী বাদ না পড়ে অর্থাৎ সকল রাবীর নামই যথাস্থানে উল্লেখ থাকে তাকে হাদীসে মুত্তাসিল বলে) এবং বিশুদ্ধ। পক্ষান্তরে এই হাদীসটি বাহ্যতঃ পরিত্যাজ্য যদি আবু সাঈদ তাবেঈর হযরত উবাই (রাঃ) হতে শুনা সাব্যস্ত না হয়। আর যদি শুনা সাব্যস্ত হয় তবে হাদীসটি যথার্থতার শর্তের উপর নির্ভরশীল। আল্লাহ তাআলাই এ সম্পর্কে সবচেয়ে ভাল জানেন। এই হাদীসটির আরও অনেক সূত্র রয়েছে। মুসনাদ-ই- আহমাদে রয়েছে, হযরত আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত উবাই বিন কা'বের (রাঃ) নিকট যান যখন তিনি নামায পড়ছিলেন। অতঃপর তিনি বলেনঃ “হে উবাই (রাঃ)! এতে তিনি (তার ডাকের প্রতি মনোযোগ দেন কিন্তু কোন উত্তর দেন নি। আবার তিনি বলেনঃ “হে উবাই (রাঃ)!' তিনি বলেনঃ ‘আস্সালামু আলাইকা।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘ওয়াআলাইকাস সালাম। তারপর বলেনঃ “হে উবাই (রাঃ)! আমি তোমাকে ডাক দিলে উত্তর দাওনি কেন?' তিনি বলেনঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি নামাযে ছিলাম।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন উপরোক্ত আয়াতটিই পাঠ করে বলেনঃ তুমি কি এই আয়াতটি শুননি? তিনি বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! হাঁ (আমি শুনেছি) এরূপ কাজ আর আমার দ্বারা হবে না।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বলেনঃ তুমি কি চাও যে, তোমাকে আমি এমন একটি সূরার কথা বলে দেই যার মত কোন সূরা তাওরাত, ইঞ্জীল এবং কুরআনের মধ্যেই নেই? তিনি বলেনঃ হ্যা অবশ্যই বলুন।' তিনি বলেনঃ এখান থেকে যাবার পূর্বেই আমি তোমাকে তা বলে দেবো।' অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার হাত ধরে চলতে চলতে অন্য কথা বলতে থাকেন, আর আমি ধীর গতিতে চলতে থাকি। এই ভয়ে যে না জানি কথা থেকে যায় আর রাসূলুল্লাহ (সঃ) বাড়ীতে পৌছে যান। অবশেষে দরজার নিকট পৌছে আমি তাঁকে তাঁর অঙ্গীকারের কথা স্মরণ করিয়ে দেই।' তিনি বলেনঃ নামাযে কি পড়’ আমি উম্মুল কুরা’ পড়ে শুনিয়ে দেই।' তিনি বলেনঃ “সেই আল্লাহর শপথ যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে, এরূপ কোন সূরা তাওরাত, ইঞ্জীল, জবুর এবং কুরআনের মধ্যে নেই। এটাই হলো ‘সাবআ মাসানী'। জামেউত তিরমিযীর মধ্যে আরও একটু বেশী আছে। তা হলো এই যে, এটাই বড় কুরআন যা আমাকে দান করা হয়েছে। এই হাদীসটি সংজ্ঞা ও পরিভাষা অনুযায়ী হাসান ও সহীহ। হযরত আনাস (রাঃ) হতেও এ অধ্যায়ে একটি হাদীস বর্ণিত আছে। মুসনাদ-ই-আহমাদেও এইভাবে বর্ণিত আছে। ইমাম তিরমিযী (রঃ) একে পরিভাষার প্রেক্ষিতে হাসান গারীব বলে থাকেন। মুসনাদ-ই-আহমাদে হযরত আবদুল্লাহ বিন জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, একদা আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করি। সে সময় সবেমাত্র তিনি সৌচ ক্রিয়া সম্পাদন করেছেন। আমি তিনবার সালাম দেই কিন্তু তিনি উত্তর দিলেন না। তিনি তো বাড়ীর মধ্যেই চলে গেলেন, আমি দুঃখিত, ও মর্মাহত অবস্থায় মসজিদে প্রবেশ করি। অল্পক্ষণ পরেই পবিত্র হয়ে তিনি আগমন করেন এবং তিনবার সালামের জওয়াব দেন। অতঃপর বলেন, “হে আবদুল্লাহ বিন জাবির (রাঃ)! জেনে রেখো, সম্পূর্ণ কুরআনের মধ্যে সর্বোত্তম সূরা হলো (আরবী) এই সূরাটি। এর ইসনাদ খুব চমক্কার। এর বর্ণনাকারী ইবনে আকীলের হাদীস বড় বড় ইমামগণ বর্ণনা করে থাকেন। এই আবদুল্লাহ বিন জাবির বলতে আবদী সাহাবীকে (রাঃ) বুঝানো হয়েছে। ইবনুল জাওযীর কথা এটাই। আল্লাহ তাআলা এ ব্যাপারে সবচেয়ে ভাল জানেন। হাফিয ইবনে আসাকীরের (রঃ) অভিমত এই যে, ইনি হলেন আবদুল্লাহ বিন জাবির আনসারী বিয়াযী (রাঃ)। কুরআনের আয়াত ও সূরাসমূহ এবং ওগুলোর পারস্পরিক মর্যাদা এই হাদীস এবং এ ধরনের অন্যান্য হাদীসসমূহ দ্বারা প্রমাণ বের করে ইবনে রাহ্ইয়াহ, আবু বকর বিন আরবী, ইবনুল হাযার (রঃ) প্রমুখ অধিকাংশ আলেমগণ বলেছেন যে, কোন আয়াত এবং কোন সূরা অপর কোন আয়াত ও সূরার চেয়ে বেশী মর্যাদার অধিকারী। আবার অন্য একদলের ধারণা এই যে, আল্লাহর কালাম সবই সমান। একের উপর অন্যের প্রাধান্য দিলে যে অসুবিধার সৃষ্টি হবে তা হলো অন্য আয়াত ও সূরাগুলি কম মর্যাদা সম্পন্ন রূপে পরিগণিত ও প্রতিপন্ন হবে। অথচ আল্লাহপাকের সমস্ত কালামই সমমর্যাদাপূর্ণ। কুরতুবী এটাই নকল করেছেন আশআরী, আবু বকর বাকিল্লানী, আবু হাতিম ইবনে হাব্বান কূসতী, আবু হাব্বান এবং ইয়াহইয়া বিন ইয়াহইয়া হতে। ইমাম মালিক (রঃ) হতেও এই মর্মের অন্য একটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে। সূরা-ই-ফাতিহার মর্যাদার ব্যাপারে উপরোল্লিখিত হাদীসসমূহ ছাড়াও আরও হাদীস রয়েছে। সহীহ বুখারী শরীফের ফাযায়িলুল কুরআন অধ্যায়ে হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ “একবার আমরা সফরে ছিলাম। এক স্থানে আমরা অবতরণ করি। হঠাৎ একটি দাসী এসে বললোঃ “এ জায়গার গোত্রের নেতাকে সাপে কেটেছে। আমাদের লোকেরা এখন সবাই অনুপস্থিত। ঝাড় ফুক দিতে পারে এমন কেউ আপনাদের মধ্যে আছে কি? আমাদের মধ্য হতে একটি লোক তার সাথে গেল। সে যে ঝাড় ফুকও জানতো তা আমরা জানতাম না। তথায় গিয়ে সে কিছু ঝাড় ফুক করলো। আল্লাহর অপার মহিমায় তৎক্ষণাৎ সে সম্পূর্ণরূপে আরোগ্য লাভ করলো। অনন্তর সে ৩০টি ছাগী দিল এবং আমাদের আতিথেয়তায় অনেক দুধও পাঠিয়ে দিল। সে ফিরে আসলে আমরা তাকে জিজ্ঞেস করলামঃ “তোমার কি এ বিদ্যা জানা ছিল?' সে বললোঃ 'আমিতো শুধু সূরা-ই-ফাতিহা পড়ে ফুক দিয়েছি। আমরা বললামঃ “তাহলে এ প্রাপ্ত মাল এখনও স্পর্শ করো না। প্রথমে ক্লাসূলুল্লাহ (সঃ) কে জিজ্ঞেস করো।' মদীনায় আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে এ ঘটনা আনুপূর্বিক বর্ণনা করলাম। তিনি বললেনঃ “এটা যে ফুক দেয়ার সূরা তা সে কি করে জানলো? এ মাল ভাগ করো। আমার জন্যেও একভাগ রেখো।' সহীহ মুসলিম ও সুনান-ই আবি দাউদেও এ হাদীসটি রয়েছে। সহীহ মুসলিমের কোন কোন বর্ণনায় আছে যে, ফুক দাতা হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) ছিলেন। সহীহ মুসলিম ও সুনান-ই নাসাঈর মধ্যে হাদীস আছে যে, একদা হযরত জিব্রাঈল (আঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকটে বসেছিলেন, এমন সময়ে উপর হতে এক বিকট শব্দ আসলো। হযরত জিব্রাঈল (আঃ) উপরের দিকে তাকিয়ে বললেনঃ আজ আকাশের ঐ দরজাটি খুলে গেছে যা ইতিপূর্বে কখনও খুলেনি। অতঃপর সেখান হতে একজন ফেরেশতা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এসে বললেন, আপনি খুশি হোন! এমন দুটি নূর আপনাকে দেয়া হলো যা ইতিপূর্বে কাউকেও দেয়া হয়নি। তা হলো সূরা-ই-ফাতিহা ও সূরা-ই- বাকারার শেষ আয়াতগুলো। ওর এক একটি অক্ষরের উপর নূর রয়েছে। এটা সুনান-ই-নাসাঈর শব্দ। সহীহ মুসলিমে হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি নামাযে উম্মুল কুরআন পড়লো না তার নামায অসম্পূর্ণ, অসম্পূর্ণ, অসম্পূর্ণ পূর্ণ নয়। হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) কে জিজ্ঞেস করা হলোঃ “আমরা যদি ইমামের পিছনে থাকি তা হলে? তিনি বললেনঃ “তাহলেও চুপে চুপে পড়ে নিও। আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ) হতে শুনেছি, তিনি বলতেন যে, আল্লাহ ঘোষণা করেনঃ “আমি নামাযকে আমার এবং আমার বান্দার মধ্যে অর্ধ-অর্ধ করে ভাগ করেছি এবং আমার বান্দা আমার কাছে যা চায়। তা আমি তাকে দিয়ে থাকি। যখন বান্দা বলে, (আরবী) তখন আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ আমার বান্দা আমার প্রশংসা করলো’ বান্দা যখন বলে, (আরবী) তখন আল্লাহ বলেনঃ অর্থাৎ বান্দা আমার গুণাগুণ বর্ণনা করলো। বান্দা যখন বলে, (আরবী) তখন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ আমার বান্দা আমার মাহাত্ম্য বর্ণনা করলো।' কোন কোন বর্ণনায় আছে যে, আল্লাহ তা'আলা উত্তরে বলেন (আরবী) অর্থাৎ ‘বান্দা আমার উপর (সবকিছু) সর্মপণ করলো। যখন বান্দা বলে (আরবী) তখন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “এটা আমার ও আমার বান্দার মধ্যেকার কথা এবং আমার বান্দা আমার নিকট যা চাইবে আমি তাকে তাই দেবো' অতঃপর বান্দা শেষ পর্যন্ত পড়ে। তখন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “এসব আমার বান্দার জন্যে এবং সে যা কিছু চাইলো তা সবই তার জন্য।' সুনান-ই নাসাঈর মধ্যে এই বর্ণনাটি আছে। কোন কোন বর্ণনার শব্দগুলির মধ্যে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এই হাদীসটিকে পরিভাষা অনুযায়ী হাসান বলেছেন। আবু জারাআ' একে সঠিক বলেছেন। মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যেও এ হাদীসটি লম্বা ও চওড়াভাবে রয়েছে। ওর বর্ণনাকারী হচ্ছেন হযরত উবাই বিন কা'ব (রাঃ)। ইবনে জারীরের একটি বর্ণনায় এ হাদীসটির মধ্যে এই শব্দগুলিও রয়েছে যে, আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ ‘এটা আমার জন্য যা অবশিষ্ট রয়েছে তা আমার বান্দার জন্য।' অবশ্য এ হাদীসটি এর উসূল বা মূলনীতির পরিভাষা অনুসারে গারীব বা দুর্বল। আলোচ্য হাদীসের উপকার সমূহ, তৎসম্পর্কিত আলোচনা ও ফাতিহার অন্যান্য বৈশিষ্ট্য। এখন এই হাদীসের উপকারিতা ও লাভালাভ লক্ষ্যণীয় বিষয়। প্রথমতঃ এই হাদীসের মধ্যে (আরবী) অর্থাৎ নামাযের সংযোজন রয়েছে এবং তার তাৎপর্যও ভাবার্থ হচ্ছে কিরআত। যেমন কুরআনের মধ্যে অন্যান্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ স্বীয় নামায (কিরআত) কে খুব উচ্চৈঃস্বরে পড়ো না আর খুব নিম্ন স্বরেও না, বরং মধ্যম স্বরে পড়।' (১৭:১১০) এর তাফসীরে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে প্রকাশ্যভাবে বর্ণিত আছে যে, এখানে (আরবী) এর অর্থ হলো কিরাআত বা কুরআন পঠন। এভাবে উপরোক্ত হাদীসে কিরাআতকে সালাত বলা হয়েছে। এতে নামাযের মধ্যে কিরাআতের যে গুরুত্ব রয়েছে তা বিলক্ষণ জানা যাচ্ছে। আরও প্রকাশ থাকে যে, কিরআত নামাযের একটি মস্তবড় স্তম্ভ (এ জন্যেই এককভাবে ইবাদতের নাম নিয়ে ওর একটি অংশ অর্থাৎ কিরা'আতকে উদ্দেশ্য করা হয়েছে। অপরপক্ষে এমনও হয়েছে যে, এককভাবে কিরাআতের নাম নিয়ে তার অর্থ নামায নেয়া হয়েছে। যেমন আল্লাহ তা'আলার কথাঃ (আরবী) অর্থাৎ ‘ফজরের কুরআনের সময় ফেরেশতাকে উপস্থিত করা হয়।' (১৭:৭৮) এখানে কুরআনের ভাবার্থ হলো নামায। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের হাদীসে রয়েছে যে, ফজরের নামাযের সময় রাত্রি ও দিনের ফেরেশতাগণ একত্রিত হন। এই আয়াত ও হাদীসসমূহ দ্বারা বিলক্ষণ জানা গেল যে, নামাযে কিরাআত পাঠ খুবই জরুরী এবং আলেমগণও এ বিষয়ে একমত। দ্বিতীয়তঃ নামাযে সূরা-ই ফাতিহা পড়াই জরুরী কি না এবং কুরআনের মধ্য হতে যা কিছু পড়ে নেওয়াই যথেষ্ট কি না এ ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। ইমাম আবু হানীফা (রঃ) এবং তাঁর সহচরগণ বলেন যে, নির্ধারিতভাবে যে সূরা ফাতিহাই পড়তে হবে এটা জরুরী নয়। বরং কুরআনের মধ্য হতে যা কিছু পড়ে নেবে তাই যথেষ্ট। তাঁর দলীল হলো (আরবী) (৭৩:২০) এই আয়াতটি। অর্থাৎ কুরআনের মধ্য হতে যা কিছু সহজ হয় তাই পড়ে নাও।' সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে যে হাদীস আছে তাতে উল্লেখ আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাড়াতাড়ি নামায আদায়কারী এক ব্যক্তিকে বললেনঃ যখন তুমি নামাযের জন্যে দাঁড়াবে তখন তাকবীর বলবে এবং কুরআনের মধ্য হতে যা তোমার নিকট সহজ বোধ হবে তাই পড়বে।' তারা বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) লোকটিকে সূরা ফাতিহা পড়ার কথা নির্দিষ্টভাবে বলেন না এবং যে কোন কিছু পড়াকেই যথেষ্ট বলে মনে করলেন। দ্বিতীয় মত এই যে, সূরা ফাতিহা পড়াই জরুরী এবং অপরিহার্য এবং তা পড়া ছাড়া নামায হয় না। অন্যান্য সমস্ত ইমামের এটাই মত। ইমাম মালিক (রঃ), ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রঃ) এবং তাঁদের ছাত্র ও জমহুর উলামা সবারই এটাই অভিমত। এই হাদীসটি তাঁদের দলীল যা রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি যে কোন নামায পড়লো এবং তাতে উম্মুল কুরআন পাঠ করলো না, ঐ নামায অসম্পূর্ণ, অসম্পূর্ণ অসম্পূর্ণ-পূর্ণ নয়। এরকমই ঐসব বুযুর্গ ব্যক্তিদের এটাও দলীল যা সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি সূরা-ই ফাতিহা পড়ে না তার নামায হয় না।' সহীহ ইবনে খুযাইমাহ্ ও সহীহ ইবনে হিব্বানের মধ্যে হযরত আবু হুরাইরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ঐ নামায হয় না যার মধ্যে উম্মুল কুরআন পড়া না হয়। এ ছাড়া আরও বহু হাদীস রয়েছে। এখানে আমাদের বিতর্কমূলক দৃষ্টিকোণ থেকে আলোচনার তেমন প্রয়োজন নেই। কারণ এ আলোচনা অতি ব্যাপক ও দীর্ঘ। আমরা তো সংক্ষিপ্তভাবে শুধু উপরোক্ত মনীষীর দলীলসমূহ এখানে বর্ণনা করে। দিলাম। এখন এটাও স্মরণীয় বিষয় যে, ইমাম শাফিঈ (রঃ) প্রভৃতি মহান আলেমদের একটি দলের মাযহাব এটাই যে, প্রতি রাকাআতে সূরা-ই-ফাতিহা পড়া ওয়াজিব এবং অন্যান্য লোকের মতে অধিকাংশ রাকআতে পড়া ওয়াজিব। হযরত হাসান বসরী (রঃ) এবং বসরার অধিকাংশ লোকেই বলেন যে, নামাযসমূহের মধ্যে কোন এক রাকাআতে সূরা ফাতিহা পড়ে নেয়া ওয়াজিব। কেননা হাদীসের মধ্যে সাধারণভাবে নামাযের উল্লেখ করা হয়েছে। ইমাম আবু হানীফা (রঃ) এবং তাঁর অনুসারী সুফিয়ান সাওরী (রঃ) ও আওযায়ী (রঃ) বলেন যে, ফাতিহাকেই নির্দিষ্টভাবে পড়ার কোন কথা নেই বরং অন্য কিছু পড়লেই যথেষ্ট হবে। কারণ পবিত্র কুরআনের মধ্যে (আরবী) শব্দটি রয়েছে। আল্লাহ তাআলাই এ ব্যাপারে সবচেয়ে ভাল জানেন। কিন্তু এটা স্মরণ রাখা উচিত যে, সুনান-ই-ইবনে মাজায় রয়েছেঃ 'যে ব্যক্তি ফরয ইত্যাদি নামাযে সূরা-ই-ফাতিহা এবং অন্য সূরা পড়লো না তার নামায হলো না। তবে অবশ্যই এ হাদীসটির বিশুদ্ধতার ব্যাপারে সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। এসব কথার বিস্তারিত আলোচনার জন্যে শরীয়তের আহকামের বড় বড় কিতাব রয়েছে। আল্লাহ তা'আলাই এসব ব্যাপারে সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ জ্ঞানের অধিকারী। তৃতীয়তঃ মুকতাদীগণের উপর সূরা-ই-ফাতিহা পাঠ ওয়াজিব হওয়ার প্রশ্নে আলেমদের তিনটি অভিমত রয়েছে। (১) সূরা ফাতিহা পাঠ ইমামের উপর যেমন ওয়াজিব, মুকতাদির উপরও তেমনই ওয়াজিব। (২) মুকতাদির উপর কিরাআত একবারেই ওয়াজিব নয়। সূরা ফাতিহাও নয় এবং অন্য সূরাও নয়। তাদের দলীল-প্রমাণ মুসনাদ-ই-আহমাদের সেই হাদীসটি, যার মধ্যে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যার জন্যে ইমাম রয়েছে, ইমামের কিরাআতই তার কিরাআত। কিন্তু বর্ণনাটি হাদীসের পরিভাষায় একান্ত দুর্বল এবং স্বয়ং এটা হযরত জাবিরের (রাঃ) কথা দ্বারা বর্ণিত আছে। যদিও এই মারফু (যে হাদীসের সনদ রাসূলুল্লাহ (সঃ) পর্যন্ত পৌছেছে অর্থাৎ স্বয়ং তাঁর হাদীস বলে সাব্যস্ত হয়েছে তাকে মারফু হাদীস বলে) হাদীসটির অন্যান্য সনদও রয়েছে, কিন্তু কোন সনদই অভ্রান্ত ও সঠিক নয়। অবশ্য আল্লাহই এ ব্যাপারে সবচেয়ে বেশী জানেন। (৩) যে নামাযে ইমাম আস্তে কিরাআত পড়েন তাতে তো মুকতাদির উপর কিরাআত পাঠ ওয়াজিব, কিন্তু যে নামাযে উচ্চৈঃস্বরে কিরআত পড়া হয় তাতে ওয়াজিব নয়। তাদের দলীল প্রমাণ হচ্ছে সহীহ মুসলিমের হাদীসটি। তা এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “অনুসরণ করার জন্যে ইমাম নির্ধারণ করা হয়েছে। তাঁর তাকবীরের পরে তাকবীর বল এবং যখন তিনি পাঠ করেন তখন তোমরা চুপ থাক।' সুনানের মধ্যেও এই হাদীসটি রয়েছে। ইমাম মুসলিম (রঃ) এর বিশুদ্ধতা স্বীকার করেছেন। ইমাম শাফিঈরও (রঃ) প্রথম মত এটাই এবং ইমাম আহমদ (রঃ) হতেও এরূপ একটি বর্ণনা রয়েছে। এই সব মাসয়ালা এখানে বর্ণনা করার আমাদের উদ্দেশ্য এই যে, সূরা-ই ফাতিহার সঙ্গে শরীয়তের নির্দেশাবলীর যতটা সম্পর্ক রয়েছে অন্য কোন সূরার সঙ্গে ততটা সম্পর্ক নেই। মুসনাদ-ই-বাজ্জাজের মধ্যে হাদীস রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ 'যখন তোমরা বিছানায় শয়ন কর তখন যদি সূরা-ই-ফাতিহা এবং (আরবী) সূরা পড়ে নাও, তাহলে মৃত্যু ছাড়া প্রত্যেক জিনিস হতে নিরাপদে থাকবে।' ইসতি‘আযাহ বা (আরবী) ‘আউযুবিল্লাহ’-এর তাফসীর এবং তার আহকাম ও নির্দেশাবলী পবিত্র কুরআনে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ ক্ষমা করে দেয়ার অভ্যাস কর, ভাল কাজের নির্দেশ দাও এবং মূর্খদের দিক হতে মুখ ফিরিয়ে নাও, যদি শয়তানের কোন কুমন্ত্রণা এসে যায় তবে সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞাতা আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা কর।' (৭:১৯৯-২০০) অন্য এক জায়গায় বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ ‘অমঙ্গলকে মঙ্গলের দ্বারা প্রতিহত কর, তারা যা কিছু বর্ণনা করছে তা আমি খুব ভালভাবে জানি। বলতে থাক-হে আল্লাহ! শয়তানের কুমন্ত্রণা এবং তাদের উপস্থিতি হতে আমরা আপনার নিকট আশ্রয় চাচ্ছি।' (২৩:৯৬-৯৮) অন্য এক জায়গায় ইরশাদ হচ্ছেঃ (আরবী) অর্থাৎ ‘অমঙ্গলকে মঙ্গল দ্বারা পতিহত কর, তাহলে তোমার এবং অন্যের মধ্যে শক্রতা রয়েছে তা এমন হবে যে, যেন সে অকৃত্রিম সাহায্যকারী বন্ধু'। (৪১:৩৪) এ কাজটি ধৈর্যশীল ও ভাগ্যবান ব্যক্তিদের জন্যে। অর্থাৎ যখন কুমন্ত্রণা এসে পড়ে তখন সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞাতা আল্লাহ তা'আলার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা কর। এই মর্মে এই তিনটিই আয়াত আছে এবং এই অর্থের অন্য কোন আয়াত নেই। আল্লাহ তা'আলা এই আয়াতসমূহের মাধ্যমে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, মানুষের শক্রতার সবচাইতে ভাল ঔষুধ হলো প্রতিদানে তাদের সঙ্গে সৎ ব্যবহার করা। এরূপ করলে তারা তখন শত্রুতা করা থেকেই বিরত থাকবেন না, বরং অকৃত্রিম বন্ধুতে পরিণত হবে। আর শয়তানদের শত্রুতা হতে নিরাপত্তার জন্যে আল্লাহ তারই নিকট আশ্রয় চাইতে বলছেন। কেননা এই শয়তানরূপী অপবিত্র শক্রদেরকে উত্তম ব্যবহারের দ্বারাও আয়ত্তে আনা কখনো সম্ভব নয়। কারণ সে। মানুষের বিনাশ ও ধ্বংসের মধ্যে আমোদ পায় এবং তার পুরাতন শক্রতা হযরত হাওয়া ও হযরত আদম (আঃ)-এর সময় হতেই অব্যাহত রয়েছে। কুরআন ঘোষণা করছেঃ “হে আদমের সন্তানেরা! তোমাদেরকে যেন এই শয়তান পথভ্রষ্ট ও বিভ্রান্ত না করে ফেলে, যেমন তোমাদের বাপ-মাকে পথভ্রষ্ট করে। চির সুখের জান্নাত হতে বের করে দিয়েছিল। অন্য স্থানে বলা হচ্ছেঃ ‘শয়তান তোমাদের শত্রু, তাকে শত্রুই মনে কর। তার দলের তো এটাই কামনা যে তোমরা দোযখবাসী হয়ে যাও। কি! আল্লাহকে ছেড়ে শয়তানের সঙ্গে এবং তার সন্তানদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করছো? তারা তো তোমাদের পরম শত্রু। জেনে রেখো যে, অত্যাচারীদের জন্যে জঘন্য প্রতিদান রয়েছে। এতো সেই শয়তান যে আমাদের আদি পিতা হযরত আদম (আঃ)কে বলেছিলঃ “আমি তোমার একান্ত শুভাকাংখী। তা হলে চিন্তার বিষয় যে, আমাদের সঙ্গে তার চালচলন কি হতে পারে? আমাদের জন্যেই তো সে শপথ করে বলেছিলঃ মহা সম্মানিত আল্লাহর শপথ! আমি তাদেরকে বিপথে নিয়ে যাবো। তবে হ্যা, যারা তার খাটি বান্দা তারা নিরাপদে থাকবে। এ জন্যে মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ তোমরা কুরআন পাঠের সময় বিতাড়িত শয়তান হতে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা কর।' (১৬:৯৮) ঈমানদারগণ ও প্রভুর উপর নির্ভরশীল ব্যক্তিদের উপরে তার কোন ক্ষমতাই নেই। আর ক্ষমতা তো শুধু তাদের উপরই রয়েছে যারা তার সঙ্গে বন্ধুত্বের সম্পর্ক স্থাপন করে এবং আল্লাহ তা'আলার সঙ্গে শিরক করে থাকে। কারীদের একটি দল ও অন্যেরা বলে থাকেন যে, কুরআন পাঠের পর (আরবী) পড়া উচিত। এতে দু'টি উপকার রয়েছে। এক তো হলোঃ কুরআনের বর্ণনারীতির উপর আমল এবং দ্বিতীয় হলোঃ ইবাদত শেষে অহংকার দমন। আবু হাতিম সিজিসতানী এবং ইবনে ফাল্ফা হামযার এই নীতিই নকল করেছেন। যেমন আরুল কাসিম ইউসুফ বিন আলী বিন জানাদাহ (রঃ) স্বীয় কিতাব “আল ইবাদাতুল কামিল’-এর মধ্যে বর্ণনা করেছেন। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতেও এটা বর্ণিত আছে। কিন্তু হাদীসের পরিভাষায় এর ইসনাদ গারীব। ইমাম যারী (রঃ) স্বীয় তাফসীরের মধ্যে এটা নকল করেছেন এবং বলেছেন যে, ইবরাহীম নাখয়ী (রঃ) ও দাউদ যাহেরীরও (রঃ) এই অভিমত। কুরতুবী (রঃ) ইমাম মালিকের (রঃ) মাযহাবও এটাই বর্ণনা করেছেন। কিন্তু ইবনুল আরাবী একে গারীব বলে থাকেন। একটি মাযহাব এরূপ আছে যে, প্রথমে ও শেষে এই দু’বার (আরবী) পড়া উচিত। তাহলে দুটি দলীলই একত্রিত হয়ে যাবে। জমহুর উলামার প্রসিদ্ধ মাযহাব এই যে, কুরআন পাঠের পূর্বে (আরবি) পাঠ করা উচিত, তাহলে কুমন্ত্রণা হতে রক্ষা পাওয়া যাবে। সুতরাং ঐ বুযুর্গদের নিকট আয়াতের অর্থ হবেঃ “যখন তুমি পড়বে অর্থাৎ তুমি পড়ার ইচ্ছা করবে। যেমন নিম্নের আয়াতটিঃ (আরবী) অর্থাৎ যখন তুমি নামায পড়ার জন্যে দাঁড়াও" (তবে ওযু করে নাও)-এর অর্থ হলোঃ যখন তুমি নামাযের জন্য দাঁড়াবার ইচ্ছা কর।' হাদীসগুলোর ধারা অনুসারে এই অর্থটিই সঠিক বলে মনে হয়। মুসনাদ-ই-আহমাদের হাদীসে আছে যে যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) মামাযের জন্য দাঁড়াতেন তখন (আরবী) বলে নামায আরম্ভ করতেন অতঃপর, (আরবী) তিনবার পড়ে (আরবী) ‘লা-ইলাহা-ইল্লাল্লাহ’ পড়তেন। তারপর পড়তেনঃ (আরবী) সুনান-ই-আরবার মধ্যেও এ হাদীসটি রয়েছে। ইমাম তিরমিযী (রঃ) বলেন যে, এই অধ্যায়ে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ-হাদীস এটাই। (আরবী) শব্দের অর্থ হলো গলা টিপে ধরা, (আরবী) শব্দের অর্থ হলো অহংকার এবং (আরবী) শব্দের অর্থ হলো কবিতা পাঠ। ইবনে মাজা (রঃ) স্বীয় সুনানে এই অর্থ বর্ণনা করেছেন। তাতে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) নামাযে প্রবেশ করেই তিনবার। (আরবী) তিনবার এবং তিনবার (আরবী) পাঠ করতেন। অতঃপর (আরবী) পড়তেন। সুনান-ই-ইবনে মাজাতেও অন্য সনদে এই হাদীসটি সংক্ষিপ্তভাবে এসেছে। মুসনাদ-ই- আহমাদের হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তিনবার (আরবী) তাকবীর বলতেন। অতঃপর (আরবী) তিনবার বলতেন। অতঃপর (আরবী) শেষ পর্যন্ত পড়তেন। মুসনাদে-ই-আবি ইয়ালার মধ্যে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর সামনে দুটি লোকের ঝগড়া বেধে যায়। ক্রোধে একজনের নাসারন্ধ্র ফুলে উঠে। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ যদি লোকটি (আরবী) পড়ে নেয় তবে তার ক্রোধ এখনই ঠাণ্ডা ও স্তিমিত হয়ে যাবে।' ইমাম নাসাঈ (রঃ) স্বীয় কিতাব (আরবী)-এর মধ্যেও হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। মুসনাদ-ই-আহমাদ, সুনান-ই-আবি দাউদ এবং জামেউত তিরমিযীর মধ্যেও হাদীসটি রয়েছে; একটি বর্ণনায় আরও একটু বেশী আছে, তা এই যে, হযরত মুআয (রাঃ) লোকটাকে তা পড়তে বলেন। কিন্তু সে তা পড়লো না এবং ক্রোধ উত্তরোত্তর বেড়েই চললো। ইমাম তিরমিযী (রঃ) বলেন যে, এই বৃদ্ধি যুক্ত বর্ণনাটি মুরসাল। কেননা আবদু?

بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ ﴿١﴾

( سورة: আল-ফাতিহা آية: 1 )

তাফসিরে ইবন কাসির এর আরবি মূল পাঠ এখানে থাকবে।

তাফসিরে তাবারি লোড হচ্ছে...

তাফসিরে কুরতুবি লোড হচ্ছে...

তাফসিরে বাগাবি লোড হচ্ছে...

তাফসিরে সা'দি লোড হচ্ছে...

তাফসিরে জাকারিয়া লোড হচ্ছে...

আহসানুল বায়ান লোড হচ্ছে...

ফাতহুল মাজীদ লোড হচ্ছে...