বাংলা আরবি

سُبْحَانَ الَّذِي أَسْرَى بِعَبْدِهِ لَيْلًا مِنَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ إِلَى الْمَسْجِدِ الْأَقْصَى الَّذِي بَارَكْنَا حَوْلَهُ لِنُرِيَهُ مِنْ آيَاتِنَا إِنَّهُ هُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ ﴿١﴾

পবিত্র ও মহীয়ান তিনি যিনি তাঁর বান্দাহকে রাতের বেলা ভ্রমণ করিয়েছেন মাসজিদুল হারাম থেকে মাসজিদুল আকসা পর্যন্ত, যার চারপাশকে আমি কল্যাণময় করেছি। তাকে আমার নিদর্শনাবলী দেখানোর জন্য, তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা। ( সুরাঃ আল-ইসরা আয়াতঃ 1 )

সহীহ বুখারী শরীফে হযরত আবদুল্লাহ ইবনু মাসঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, সূরায়ে বাণী ইসরাঈল, সূরায়ে কাহাফ এবং সূরায়ে মারইয়াম সর্বপ্রথম, সর্বোত্তম এবং ফযীলতপূর্ণ সূরা। হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ) কখনো কখনো নফল রোযা এমনভাবে পর্যায়ক্রমে রেখে যেতেন যে, আমরা মনে মনে বলতাম, সম্ভবতঃ তিনি এই পুরো মাসটি রোযার অবস্থাতেই কাটিয়ে দিবেন। আবার কখনো কখনো মোটেই রোযা রাখতেন না। শেষ পর্যন্ত আমরা ধারণা করতাম যে, সম্ভবতঃ তিনি এই মাসে রোযা রাখবেনই না। তাঁর অভ্যাস ছিল এই যে, প্রত্যেক রাত্রে তিনি সূরায়ে বাণী ইসরাঈল ও সূরায়ে যুমার পাঠ করতেন।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদ' গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন) আল্লাহ তাআলা স্বীয় সত্তার পবিত্রতা, মর্যাদা, শ্রেষ্ঠত্ব এবং ক্ষমতার বর্ণনা দিচ্ছেন যে, তিনি সবকিছুর উপর পুর্ণক্ষমতাবান। তার ন্যায় ক্ষমতা কারো মধ্যে নেই। তিনিই ইবাদতের যোগ্য এবং একমাত্র তিনিই সমস্ত সৃষ্টজীবের লালনপালনকারী। তিনি তাঁর বান্দা অর্থাৎ হযরত মুহাম্মদকে (সঃ) একই রাত্রির একটা অংশে মক্কা শরীফের মসজিদ হতে বায়তুল মুকাদ্দাসের মসজিদ পর্যন্ত নিয়ে যান, যা হযরত ইবরাহীমের (আঃ) যুগ হতে নবীদের (আঃ) কেন্দ্রস্থল ছিল। এ কারণেই সমস্ত নবীকে (আঃ) সেখানে তাঁর পাশে একত্রিত করা হয় এবং তিনি সেখানে তাঁদেরই জায়গায় তাঁদের ইমামতি করেন। এটা একথাই প্রমাণ করে যে, বড় ইমাম ও অগ্রবর্তী নেতা তিনিই। আল্লাহর দুরূদ ও সালাম তাঁর উপর ও তাঁদের সবারই উপর বর্ষিত হোক। মহান আল্লাহ বলেনঃ এই মসজিদের চতুষ্পৰ্শ আমি ফল-ফুল, ক্ষেতখামার, বাগ-বাগিচা ইত্যাদি দ্বারা বরকতময় করে রেখেছি। আমার এই মর্যাদা সম্পন্ন নবীকে (সঃ) আমার বড় বড় নিদর্শনাবলী প্রদর্শন করা-ই ছিল আমার উদ্দেশ্য, যেগুলি তিনি ঐ রাত্রে দর্শন করেছিলেন।। আল্লাহ তাআলা তাঁর মু'মিন, কাফির, বিশ্বাসকারী এবং অস্বীকারকারী সমস্ত বান্দার কথা শুনে থাকেন এবং দেখে থাকেন। প্রত্যেককে তিনি ওটাই দেন যার সে হকদার, দুনিয়াতেও এবং আখেরাতেও। মি'রাজ সম্পর্কে বহু হাদীস রয়েছে যেগুলি এখন বর্ণনা করা হচ্ছেঃ হযরত আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, মিরাজের রাত্রে যখন কা’বাতুল্লাহ শরীফ হতে রাসূলুল্লাহকে (সঃ) ডেকে নিয়ে যাওয়া হয় সেই সময় তাঁর নিকট তিনজন ফেরেশতা আগমন করেন, তাঁর কাছে ওয়াহী করার পূর্বে। ঐ সময় তিনি বায়তুল্লাহ শরীফে শুয়ে ছিলেন। তাঁদের মধ্যে প্রথম জন জিজ্ঞেস করেনঃ “ইনি এই সবের মধ্যে কে?” মধ্যজন উত্তরে বলেনঃ “ইনি এসবের মধ্যে উত্তম।” তখন সর্বশেষজন বলেনঃ “তা হলে তাঁকে নিয়ে চল।” ঐ রাত্রে এটুকুই ঘটলো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁদেরকে দেখতে পেলেন না। দ্বিতীয় রাত্রে আবার ঐ তিনজন ফেরেশতা আসলেন। ঘটনাক্রমে রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঐ সময়েও ঘুমিয়ে ছিলেন। কিন্তু তাঁর ঘুমন্ত অবস্থা এমনই ছিল যে, তাঁর চক্ষুদ্বয় ঘুমিয়েছিল বটে, কিন্তু তাঁর অন্তর ছিল জাগ্রত। নবীদের (আঃ) নিদ্রা এরূপই হয়ে থাকে। ঐ রাত্রে তাঁরা তাঁর সাথে কোন আলাপ আলোচনা করেন নাই। তাঁরা তাঁকে উঠিয়ে নিয়ে গিয়ে যমযম কূপের নিকট শায়িত করেন এবং হযরত জিবরাঈল (আঃ) স্বয়ং তাঁর বক্ষহতে গ্রীবা পর্যন্ত বিদীর্ণ করে দেন এবং বক্ষ ও পেটের সমস্ত জিনিস বের করে নিয়ে যমযমের পানি দ্বারা ধৌত করেন। যখন খুব পরিষ্কার হয়ে যায় তখন তাঁর কাছে একটা সোনার থালা আনয়ন করা হয় যাতে বড় একটি সোনার পেয়ালা ছিল। ওটা ছিল হিকমত ও ঈমানে পরিপূর্ণ। ওটা দ্বারা তাঁর বক্ষ ও গলার শিরাগুলিকে পূর্ণ করে দেন। তারপর বক্ষকে শেলাই করে দেয়া হয়। তারপর তাঁকে দুনিয়ার আকাশের দিকে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। তথাকার দরজাগুলির একটিতে করাঘাত করা হয়। ফেরেশতাগণ জিজ্ঞেস করেনঃ “কে?” উত্তরে বলা হয়ঃ “জিবরাঈল (আঃ)।” আবার তাঁরা প্রশ্ন করেনঃ “আপনার সাথে কে আছেন?” জবাবে তিনি বলেনঃ “আমার সাথে রয়েছেন হযরত মুহাম্মদ (সঃ)।” পুনরায় তারা জিজ্ঞেস করেনঃ “তঁাকে কি ডাকাহয়েছে?” হযরত জিবরাঈল (আঃ) উত্তর দেনঃ “হ” এতে সবাই খুবই খুশী হন এবং ‘মারহাবা’ বলে অভ্যর্থনা জানিয়ে তাঁকে নিয়ে যান। যমীনে যে আল্লাহ তাআলা কি করতে চান তা আকাশের ফেরেশতারাও জানতে পারেন না। যে পর্যন্ত না তাদেরকে জানানো হয়। দুনিয়ার আকাশের উপর হযরত আদমের (আঃ) সাথে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। হযরত জিবরাঈল (আঃ) তাঁর সাথে রাসূলুল্লাহর (সঃ) পরিচয় করিয়ে দেন। তাঁকে বলেনঃ “ইনি আপনার পিতা হযরত আদম (আঃ)। তাঁকে সালাম দিন।” তিনি তাঁকে সালাম দেন। হযরত আদম (আঃ) সালামের জবাব দেন এবং মারহাবা বলে অভ্যর্থনা জানান ও বলেনঃ “আপনি আমার খুবই উত্তম ছেলে। সেখানে প্রবাহিত দু'টি নহর দেখে তিনি হযরত জিবরাঈলকে (আঃ) জিজ্ঞেস করেনঃ “এ নহর দু'টি কি?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “এ দু'টো হলো নীল ও ফোরাতের উৎস। তারপর তাঁকে আসমানে নিয়ে যান। তিনি আর একটি নহর দেখতে পান। তাতে ছিল মনিমুক্তার প্রাসাদ এবং ওর মাটি ছিল খাটি মিশকে আম্বর। তিনি জিজ্ঞেস করেনঃ “এটা কি নহর?” উত্তরে হযরত জিবরাঈল (আঃ) বলেনঃ “এটি হচ্ছে নহরে কাওসার। এটা আপনার প্রতিপালক আপনার জন্যে তৈরী করে রেখেছেন।” এরপর তাঁকে দ্বিতীয় আকাশে নিয়ে যান। তথাকার ফেরেশতাদের সাথেও অনুরূপ কথাবার্তা চলে। তারপর তাঁকে নিয়ে তৃতীয় আকাশে উঠে যান। সেখানকার ফেরেশতাদের সাথেও ঐরূপ প্রশ্ন ও উত্তরের আদান প্রদান হয় যেরূপ প্রথম ও দ্বিতীয় আকাশে হয়েছিল। অতঃপর হযরত জিবরাঈল (আঃ) রাসূলুল্লাহকে (সঃ) নিয়ে চতুর্থ আকাশে উঠে যান। তথাকার ফেরেশতাগণও অনুরূপ প্রশ্ন করেন ও উত্তর পান। তারপর পঞ্চম অকাশে তাঁকে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানেও অনুরূপ কথা শোনা যায়। এরপর তাঁরা ষষ্ট আকাশে উঠে যান। সেখানেও এরূপই কথাবার্তা চলে। তারপর সপ্তম আকাশে গমন করেন এবং তথায়ও এরূপই কথাবার্তা হয়। (বর্ণনাকারী হযরত আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) বলেনঃ প্রত্যেক আকাশে তথাকার নবীদের (আঃ) সাথে রাসূলুল্লাহর (সঃ) সাক্ষাৎ হয়। তিনি তাদের নাম করেছিলেন। যাঁদের নাম আমার স্মরণ আছে তারা হলেনঃ দ্বিতীয় আকাশে হযরত ইদরীস (আঃ), চতুর্থ আকাশে হযরত হারূণ (আঃ), পঞ্চম আকাশে যিনি ছিলেন তাঁর নাম আমার মনে নেই, ষষ্ট আকাশে ছিলেন হযরত ইবরাহীম (আঃ) এবং সপ্তম আকাশে ছিলেন হযরত মূসা (আঃ)। হযরত মুহাম্মদের (সঃ) উপর এবং অন্যান্য সমস্ত নবীর উপর আল্লাহর রহমত ও শান্তি বর্ষিত হোক। যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) এখান হতেও উপরে উঠতে থাকেন তখন হযরত মূসা (আঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহ! আমার ধারণা ছিল যে, আমার চেয়ে বেশী উপরে আপনি আর কাউকেও উঠাবেন না। এখন ইনি (হযরত মুহাম্মদ (সঃ)। যে কত উপরে উঠাবেন তা একমাত্র আপনিই জানেন।” শেষ পর্যন্ত তিনি সিদরাতুল মুনতাহা পর্যন্ত পৌঁছে যান। অতঃপর তিনি আল্লাহ তাআলার অতি নিকটবর্তী হন। ফলে তাঁদের মধ্যে দু' ধনুকের ব্যবধান থাকে বা তাঁর চেয়েও কম। অতঃপর আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে তাঁর কাছে ওয়াহী করা হয়, যাতে তাঁর উম্মতের উপর প্রত্যহ দিনরাত্রে পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামায ফরয করা হয়। যখন তিনি সেখান হতে নেমে আসেন তখন হযরত মূসা (আঃ) তাকে থামিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করেনঃ “আল্লাহ তাআলার নিকট থেকে আপনি কি হুকুম প্রাপ্ত হলেন?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “দিন রাত্রে পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামায।” হযরত মূসা (আঃ) এ হুকুম শুনে বললেনঃ “এটা আপনার উম্মতের ক্ষমতার বাইরে। আপনি ফিরে যান এবং কমানোর জন্যে প্রার্থনা করুন।” তাঁর একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত জিবরাঈলের (আঃ) দিকে পরামর্শ চাওয়ার দৃষ্টিতে তাকান এবং তিনি ইঙ্গিতে সম্মতি দান করেন। সুতরাং তিনি পুনরায় আল্লাহ তাআলার নিকট গমন করেন এবং স্বস্থানে দাঁড়িয়ে প্রার্থনা করেনঃ “হে আল্লাহ! হালকা করে দিন। এটা পালন করা আমার উম্মতের সাধ্য হবে না।” আল্লাহ তাআলা তখন দশ ওয়াক্ত নামায কমিয়ে দেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) ফিরে আসলেন। হযরত মূসা (আঃ) আবার তাকে থামিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করেনঃ “কি হলো?” জবাবে তিনি বললেনঃ “দশ ওয়াক্ত নামায কমিয়ে দিলেন।” একথা শুনে হযরত মূসা (আঃ) তাঁকে বললেনঃ “যান, আরো কমিয়ে আনুন।” তিনি আবার গেলেন। আবার কম করা হলো এবং শেষ পর্যন্ত পাঁচ ওয়াক্ত নামায থাকলো। হযরত মূসা (আঃ) তাঁকে আবারও বললেনঃ “দেখুন, বাণী ইসরাঈলের মধ্যে আমি আমার জীবন কাটিয়ে এসেছি। তাদের উপর এর চেয়েও কমের নির্দেশ ছিল, তবুও তারা ওর উপর ক্ষমতা রাখে নাই। ওটা পরিত্যাগ করেছে। আপনার উম্মত তো তাদের চেয়েও দুর্বল, দেহের দিক দিয়েও, অন্তরের দিক দিয়েও এবং চক্ষু কর্ণের দিক দিয়েও। সুতরাং আপনি আবার যান এবং আল্লাহ তাআলার নিকট এটা আরো কমানোর জন্যে আবেদন করুন।” অভ্যাস অনুযায়ী রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত জিবরাঈলের (আঃ) দিকে তাকালেন। হযরত জিবরাঈল (আঃ) তাঁকে উপরে নিয়ে গেলেন। তিনি আল্লাহ তাআলার নিকট আবেদন জানালেনঃ “হে আল্লাহ! আমার উম্মতের অন্তর, কর্ণ, চক্ষু এবং দেহ দুর্বল। সুতরাং দয়া করে এটা আরো কমিয়ে দিন” তৎক্ষণাৎ আল্লাহ তাআলা বললেনঃ “হে মুহাম্মদ (সঃ)! “রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “লাব্বায়কা ওয়া সা’দায়কা (আমি আপনার নিকট হাজির আছি)।” আল্লাহ তাআলা বললেনঃ “জেনে রেখো যে, আমার কথার কোন পরিবর্তন নাই। আমি যা নির্ধারণ করেছি তাই আমি উম্মুল কিতাবে লিখে দিয়েছি। পড়ার হিসেবে এটা পাচই থাকলো, কিন্তু সওয়াবের হিসেবে পঞ্চাশই রইলো।” যখন তিনি ফিরে আসলেন তখন হযরত মূসা (আঃ) তাঁকে বললেনঃ “প্রার্থনা মঞ্জুর হলো কি?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “হাঁ, কম করা হয়েছে অর্থাৎ পাঁচ ওয়াক্তের উপর পঞ্চাশ ওয়াক্তের সওয়াব পূর্ণ হয়েছে। প্রত্যেক সৎ কাজের সওয়াব দশগুণ করা হয়েছে।” হযরত মূসা (আঃ) আবার বললেনঃ “আমি বাণী ইসরাঈলকে পরীক্ষা করেছি। তারা এর চেয়ে হালকা হুকুমকেও পরিত্যাগ করেছে। সুতরাং আপনি আবার গিয়ে প্রতিপালকের কাছে এটা আরো কমানোর আবেদন করুন। এবার রাসূলুল্লাহ (সঃ) জবাব দিলেনঃ “হে কালীমুল্লাহ (আঃ)! এখন তো আমি আবার তাঁর কাছে যেতে লজ্জা পাচ্ছি।” তখন তিনি বললেনঃ “ঠিক আছে। তাহলে যান ও আল্লাহর নামে শুরু করে দিন।” অতঃপর তিনি জেগে দেখেন যে, তিনি মসজিদে হারামে রয়েছেন। (এ হাদীসটি সহীহ বুখারীতে বর্ণিত হয়েছে। সহীহ বুখারীর কিতাবুত তাওহীদ এবং সিফাতুন্নবী (সঃ)-এর মধ্যেও রয়েছে। এই রিওয়াইয়াতটিই শুরায়েক ইবনু আবদিল্লাহ ইবনু আবূ নামর (রাঃ) হতেও বর্ণিত আছে। কিন্তু নিজের স্মরণ শক্তির ত্রুটির কারণে সঠিকভাবে বর্ণনা করতে পারেন নাই) কেউ কেউ এটাকে স্বপ্নের ঘটনা বলেছেন যা এর শেষে এসেছে। এ সব। ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের অধিকারী। এই হাদীসের “তিনি আল্লাহর অতি নিকটবর্তী হন, এমনকি তাঁদের মধ্যে দু’ধনুকের ব্যবধান থাকে বা তার চেয়েও কম” এই কথাগুলিকে ইমাম হাফিয আবু বকর বায়হাকী (রঃ) শুরায়েক নামক বর্ণনাকারীর বাড়াবাড়ি বলে উল্লেখ করেছেন এবং এতে তিনি একাকী রয়েছেন। এজন্যেই কোন কোন গুরুজন বলেছেন যে, এ রাত্রে রাসূলুল্লাহ (সঃ) আল্লাহ তাআলাকে দেখেছিলেন। কিন্তু হযরত আয়েশা (রাঃ) , হযরত ইবনু মাসউদ (রাঃ) এবং হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) আয়াতগুলিকে এর উপর স্থাপন করেছেন যে, তিনি হযরত জিবরাঈলকে (আঃ) দেখেছিলেন। এটাই সঠিকতম উক্তি এবং ইমাম বায়হাকীর (রঃ) কথা সম্পূর্ণরূপে সত্য। অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, যখন হযরত আবু যার (রাঃ) রাসূলুল্লাহকে (সঃ) জিজ্ঞেস করেনঃ “আপনি কি আল্লাহ তাআলাকে দেখেছেন?” তখন উত্তরে তিনি বলেনঃ “তিনি তো নূর! সুতরাং আমি কি করে তাঁকে দেখতে পারি?” আর একটি রিওয়াইয়াতে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আমি নূর (জ্যোতি দেখেছি।” যা সূরায়ে নাজমে রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “অতঃপর সে তার নিকটবর্তী হলো, অতি নিকটবর্তী।” (৫৩:৮) এর দ্বারা হযরত জিবরাঈলকে (আঃ) বুঝানো হয়েছে, যেমন উক্ত তিনজন সাহাবী বর্ণনা করেছেন। সাহাবীদের মধ্যে কেউই এই আয়াতের এই তাফসীরে তাঁদের বিরুদ্ধাচরণ করেন নাই। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমার কাছে ‘বুরাক’ আনয়ন করা হয়, যা গাধার চেয়ে উঁচু ও খচ্চরের চেয়ে নীচু ছিল। ওটা ওর এক এক কদম এতো দূরে রাখছিল যত দূর ওর দৃষ্টি যায়। আমি ওর উপর সওয়ার হলাম এবং সে আমাকে নিয়ে চললো। আমি বায়তুল মুকাদ্দাস পৌঁছে গেলাম এবং ওকে দ্বারের ঐ শিকলের সাথে বেঁধে দিলাম যেখানে নবীগণ বাধতেন। তারপর আমি মসজিদে প্রবেশ করে দু রাক'আত নামায পড়লাম। যখন সেখান থেকে বের হলাম তখন হযরত জিবরাঈল (আঃ) আমার কাছে একটি পাত্রে সূরা ও একটি পাত্রে দুধ আনলেন। আমি দুধ পছন্দ করলাম। জিবরাঈল (আঃ) বললেনঃ “আপনি ফিরত (প্রকৃতি) পর্যন্ত পৌঁছে গেছেন।" তারপর উপরোক্ত হাদীসের বর্ণনার মতই তিনি প্রথম আকাশে পৌঁছলেন, ওর দর উন্মুক্ত করালেন, ফেরেশতাগণ প্রশ্ন করলেন, জবাব পেলেন। প্রত্যেক আকাশেই অনুরূপ হওয়ার কথা বর্ণিত আছে। প্রথম আকাশে হযরত আদমের (আঃ) সাথে সাক্ষাৎ হলো। তিনি মারহাবা বললেন এবং কল্যাণের জন্যে দুআ করলেন। দ্বিতীয় আকাশে হযরত ইয়াহইয়া (আঃ) ও হযরত ঈসার (আঃ) সাথে সাক্ষাৎ হওয়ার কথা বর্ণিত হয়েছে। যারা একে অপরের খালাতো ভাই ছিলেন। তাঁরা দুজনও তাঁকে মারহাবা বললেন এবং কল্যাণের জন্যে প্রার্থনা করলেন। তৃতীয় আকাশে সাক্ষাৎ হলো হযরত ইউসুফের (আঃ) সাথে যাকে অর্ধেক সৌন্দর্য দেয়া হয়েছিল। তিনিও মারহাবা বললেন ও মঙ্গলের দুআ করলেন। তারপর চতুর্থ আকাশে হযরত ইদরীসের (আঃ) সাথে সাক্ষাৎ হলো, যাঁর সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “আমি তাকে উন্নীত করেছিলাম উচ্চ মর্যাদায়।” পঞ্চম আকাশে সাক্ষাৎ হয় হযরত হারূণের (আঃ) সাথে। ষষ্ঠ আকাশে হযরত মূসার (আঃ) সাথে। সপ্তম আকাশে হযরত ইবরাহীমকে (আঃ) বায়তুল মা'মূরে হেলান দেয়া অবস্থায় দেখতে পান। বায়তুল মা'মূর প্রত্যহ সত্তর হাজার ফেরেশতা গমন করে থাকেন, কিন্তু আজ যারা যান তাঁদের পালা কিয়ামত পর্যন্ত আর আসবে না। তারপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) সিদরাতুল মুনতাহায় পৌঁছেন, যার পাতা ছিল হাতীর কানের সমান এবং যার ফল ছিল বৃহৎ মৃৎপাত্রের মত। ওটাকে আল্লাহ তাআলার আদেশে ঢেকে রেখেছিল। ওর সৌন্দর্যের বর্ণনা কেউই দিতে পারে না। তারপর ওয়াহী হওয়া, পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামায ফরয হওয়া এবং হযরত মূসার (আঃ) পরামর্শক্রমে ফিরে গিয়ে কমাতে কমাতে পাঁচ ওয়াক্ত পর্যন্ত পৌঁছার বর্ণনা রয়েছে। তাতে এও রয়েছে যে, পরিশেষে রাসূলুল্লাহকে (সঃ) বলা হয়ঃ “যে ব্যক্তি কোন ভাল কাজের ইচ্ছা করে, যদি সে ওটা করতে না পারে তবুও তার জন্যে একটি নেকী লিখা হয়। আর যদি করে ফেলে তবে দশটি নেকী সে পেয়ে থাকে। পক্ষান্তরে কেউ যদি কোন পাপ কার্যের ইচ্ছা করে অতঃপর তা না করে তবে তার জন্যে কোন পাপ লিখা হয় না। আর যদি করে বসে তবে একটি মাত্র পাপ লিখা হয়। (এ হাদীসটি এভাবে মুসনাদে আহমদে বর্ণিত হয়েছে। সহীহ মুসলিমেও এভাবে বর্ণিত আছে) এ হাদীস দ্বারা এটাও জানা যাচ্ছে যে, যেই রাত্রে রাসূলুল্লাহকে (সঃ) বায়তুল্লাহ হতে বায়তুল মুকাদ্দাস পর্যন্ত ভ্রমণ করানো হয় সেই রাত্রেই মি'রাজও হয় এবং এটা সত্যও বটে এতে সন্দেহের লেশ মাত্র নেই। মুসনাদে আহমদে রয়েছে যে, বুরাকের লাগামও ছিল এবং জিন বা গদীও ছিল। রাসূলুল্লাহর (সঃ) সওয়ার হওয়ার সময় যখন সে ছটফট করতে থাকে তখন হযরত জিবরাঈল (আঃ) তাকে বলেনঃ “তুমি এটা কি করছো? আল্লাহর কসম! তোমার উপর ইতিপূর্বে এঁর চেয়ে সম্মানিত ব্যক্তি কখনো সওয়ার হয় নাই।” একথা শুনে বুরাক সম্পূর্ণরূপে শান্ত হয়ে যায়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “যখন আমাকে আমার মহামহিমান্বিত প্রতিপালকের দিকে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় তখন আমার গমন এমন কতকগুলি লোকের পার্শ্ব দিয়ে হয় যাদের তামার নখ ছিল, যার দ্বারা তারা নিজেদের মুখমণ্ডল ও বক্ষ নুচতে ছিল।” আমি। হযরত জিবরাঈলকে (আঃ) জিজ্ঞেস করলামঃ “এরা কারা?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “এরা হচ্ছে ওরাই যারা লোকের গোশত ভক্ষণ করতো (অর্থাৎ গীবত করতো) এবং তাদের মর্যাদার হানি করতো।” সুনানে আবি দাউদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যখন আমি হযরত মূসার (আঃ) কবরের পার্শ্ব দিয়ে গমন করি তখন তাঁকে ওখানে নামাযে দণ্ডায়মান অবস্থায় দেখতে পাই।” হযরত আবু বকর (রাঃ) রাসূলুল্লাহকে (সঃ) মাসজিদুল আকসার (বায়তুল মুকাদ্দাসের চিহ্নগুলি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলতে শুরু করে দেন। তিনি বলতেই আছেন এমতাবস্থায় হযরত আবু বকর (রাঃ) তাকে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি সত্য বর্ণনাই দিচ্ছেন এবং আপনি চরম সত্যবাদী। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি আল্লাহর রাসূল।” হযরত আবু বকর (রাঃ) মাসজিদুল আকসা পূর্বে দেখেছিলেন। মুসনাদে বায্যারে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমি শুয়েছিলাম এমতাবস্থায় হযরত জিবরাঈল (আঃ) আগমন করেন এবং আমার দু’কাঁধের মাঝে হাত রাখেন। আমি তখন দাঁড়িয়ে গিয়ে এক গাছে বসে যাই যাতে পাখীর বাসার মত কিছু ছিল। একটিতে হযরত জিবরাঈল (আঃ) বসে যান। তখন ঐ গাছটি ফুলে উঠলো ও উঁচু হতে শুরু হলো, এমনকি আমি ইচ্ছা করলে আকাশ ছুঁয়ে নিতে পারতাম। আমি তো আমার চাদর ঠিক করছিলাম, কিন্তু দেখলাম যে, হযরত জিবরাঈল (আঃ) অত্যন্ত বিনীত অবস্থায় রয়েছেন। তখন আমি বুঝতে পারলাম যে, আল্লাহর মারেফাতের জ্ঞানে তিনি আমার চেয়ে উত্তম। আকাশের একটি দরজা আমার জন্যে খুলে দেয়া হলো। আমি এক যবরদস্ত ও জাঁকজমকপূর্ণ নূর দেখলাম যা পর্দার মধ্যে ছিল। আর ওর ঐদিকে ছিল ইয়াকূত ও মণিমুক্তা তারপর আমার কাছে অনেক কিছু ওয়াহী করা হয়।” দালায়েলে বায়হাকীতে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় সাহাবীদের জামাআতে বসে ছিলেন, এমন সময় হযরত জিবরাঈল (আঃ) আগমন করলেন এবং অঙ্গুলি দ্বারা পিঠে ইশারা করলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর একটি গাছের দিকে চললেন যাতে পাখীর বাসার মত বাসা ছিল। (শেষপর্যন্ত) তাতে এও আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “যখন আমাদের দিকে নূর অবতীর্ণ হলো তখন হযরত জিবরাঈল (আঃ) বেহুশ হয়ে পড়ে গেলেন। (শেষ পর্যন্ত)।” অতঃপর তিনি বলেনঃ“ এরপর আমার কাছে ওয়াহী আসলো “নবী এবং বাদশাহ হতে চাও, না নবীও বান্দা হয়ে জান্নাতী হতে চাও?” হযরত জিবরাঈল (আঃ) ঐভাবেই বিনয়ের সাথে পড়ে ছিলেন, ইশারায় তিনি আমাকে বললেনঃ “বিনয় অবলম্বন করুন।” আমি তখন উত্তরে বললাম :হে আল্লাহ! আমি নবী ও বান্দা হতে চাই।” (দালায়েলে বায়হাকীর এই রিওয়াইয়াত যদি সঠিক হয় তবে সম্ভবতঃ এটা মিরাজের ঘটনা না হয়ে অন্য কোন ঘটনা হবে। কেননা, এতে বায়তুল মুকাদ্দাসের কোন উল্লেখ নেই এবং আকাশের আরোহণেরও কোন কথা নেই। এসব ব্যাপারে সঠিক জ্ঞানের অধিকারী একমাত্র আল্লাহ) মুসনাদে বায্যারে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আল্লাহ তাআলাকে দেখেছিলেন। কিন্তু এ রিওয়াইয়াতটিও গারীব। (যে সহীহ হাদীসে মাত্র একজন বর্ণনাকারী থাকেন তাকে গারীব হাদীস বলা হয়) তাফসীরে ইবনু জারীরে বর্ণিত আছে যে, বুরাক যখন হযরত জিবরাঈলের (আঃ) কথা শুনে এবং রাসূলুল্লাহকে (সঃ) সওয়ার করিয়ে নিয়ে চলতে শুরু করে তখন তিনি পথের এক ধারে এক বুড়িকে দেখতে পান। এই বুড়িটি কে তা তিনি হযরত জিবরাঈলের (আঃ) কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেনঃ চলুন।” আবার চলতে চলতে পথে কোন একজনকে দেখতে পান যে তাঁকে ডাকতে রয়েছে। আরো কিছু দূর গিয়ে তিনি আল্লাহর এক মাখলূখককে দেখতে পান, যে উচ্চ স্বরে বলতে রয়েছেঃ (আরবি) হযরত জিবরাঈল (আঃ) সালামের জবাব দিলেন। দ্বিতীয়বারও এইরূপই ঘটলো এবং তৃতীয়বারও এটাই ঘটলো। শেষ পর্যন্ত তিনি বায়তুল মুকাদ্দাসে। পৌঁছে গেলেন। সেখানে তাঁর সামনে পানি, মদ ও দুধ হাজির করা হলো। তিনি দুধ গ্রহণ করলেন। হযরত জিবরাঈল (আঃ) বললেনঃ “আপনি ফিতরাতের (প্রকৃতির) রহস্য পেয়ে গেছেন। যদি আপনি পানির পাত্র নিয়ে পান করতেন তবে আপনার উম্মত ডুবে যেতো। পথভ্রষ্ট হয়ে যেতো।” অতঃপর রাসূলুল্লাহর (সঃ) সামনে হযরত আদম (আঃ) থেকে নিয়ে তাঁর যুগের পূর্ব পর্যন্ত সমস্ত নবীকে পেশ করা হলো। তিনি তাঁদের সবারই ইমামতি করলেন। ঐ রাত্রে সমস্ত নবী নামাযে তাঁর ইকতিদা করলেন। এরপর হযরত জিবরাঈল (আঃ) তাঁকে বলেনঃ “যে বুড়িকে আপনি পথের ধারে দেখেছিলেন, তাকে যেন এজন্যেই দেখানো হয়েছিল যে, দুনিয়ার বয়স ততটুকুই বাকী আছে যতটুকু বাকী আছে এই বুড়ীর বয়স। আর যে শব্দের দিকে আপনি মনোযোগ দিয়েছিলেন সে ছিল আল্লাহর শত্রু ইবলীস। যাদের সালামের শব্দ আপনার কাছে পৌঁছেছিল তারা ছিলেন হযরত ইবরাহীম (আঃ), হযরত মূসা (আঃ) এবং হযরত ঈসা আঃ)।” (এবৰ্ণনাতেও গারাবাত (অস্বাভাবিকতা) ও নাকারাত বা অস্বীকৃতি রয়েছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলার জ্ঞানই সবচেয়ে বেশী) অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যখন আমি হযরত জিবরাঈলের (আঃ) সাথে বুরাকে চলি তখন এক জায়গায় তিনি আমাকে বলেনঃ “এখানে নেমে নামায আদায় করে নিন।” নামায শেষে তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করেনঃ “এটা কোন জায়গা তা জানেন কি?” আমি উত্তরে বলিঃ না। তিনি বলেনঃ “এটা তায়্যেবা অর্থাৎ মদীনা। এটাই হচ্ছে হিজরতের জায়গা।” তারপর তিনি আমাকে আর এক জায়গায় নামায পড়ান এবং বলেনঃ “এটা হচ্ছে ভূরে সাইনা”। এখানে আল্লাহ তাআ’লাহযরত মূসার (আঃ) সাথে কথা বলেন। তারপর তিনি আমাকে আর এক স্থানে নামায পড়ান ও বলেনঃ “এটা হলো বায়তে লাহাম। এখানে হযরত ঈসা (আঃ) জন্ম গ্রহণ বরেন। এরপর আমি বায়তুল মুকাদ্দাসে পৌঁছি। সেখানে সমস্ত নবী একত্রিত হন। হযরত জিবরাঈল (আঃ) আমাকে ইমাম নির্বাচন করেন। আমি তাঁদের ইমামতি করি। অতঃপর তিনি আমাকে নিয়ে আকাশে উঠে যান।” এরপর তাঁর এক এক আকাশে পৌছা এবং বিভিন্ন আকাশে বিভিন্ন নবীদের সাথে সাক্ষাৎ হওয়ার কথা বর্ণিত হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “যখন আমি সিদরাতুল মুনতাহায় পৌছলাম তখন আমাকে একটি নূরানী মেঘে ঢেকে নেয়। তখনই আমি সিজদায় পড়ে গেলাম।” তারপর তার উপর পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামায ফরয হওয়া এবং পরে কমে যাওয়া ইত্যাদির বর্ণনা রয়েছে। শেষে হযরত মূসার (আঃ) বর্ণনায় রয়েছেঃ “আমার উম্মতের উপর তো মাত্র দু'ওয়াক্ত নামায নির্ধারণ করা হয়েছিল, কিন্তু ওটাও তারা পালন করে নাই।” তাঁর এই কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) পাঁচ ওয়াক্ত হতে আরো কমাবার জন্যে গেলেন। তখন আল্লাহ তাআলা তাকে বললেনঃ “আমি তো আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টি করার দিনই তোমার উপর ও তোমার উম্মতের উপর পাঁচ ওয়াক্ত নামায ফরয করে রেখেছিলাম। এটা পড়তে পাঁচ ওয়াক্ত, কিন্তু সওয়াব হবে পঞ্চাশ ওয়াক্তের সমান। সুতরাং তুমি ও তোমার উম্মত যেন এর রক্ষণাবেক্ষণ কর।” আমার তখন দৃঢ় প্রত্যয় হলো যে, এটাই আল্লাহ তাআলার শেষ হুকুম। অতঃপর আবার যখন আমি হযরত মূসার (আঃ) কাছে পৌছলাম তখন আবার তিনি আমাকে আল্লাহ তাআলার নিকট ফিরে যাওয়ার পরামর্শ দিলেন, কিন্তু আমার দৃঢ় বিশ্বাস হিসেবে এটাই ছিল আল্লাহ তাআলার অকাট্য হুকুম, তাই আমি আর তাঁর কাছে ফিরে গেলাম না।” মুসনাদে ইবনু আবি হাতিমেও মিরাজের ঘটনাটির সুদীর্ঘ হাদীস রয়েছে। তাতে এও রয়েছে যে, যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বায়তুল মুকাদ্দাসের মসজিদের পার্শ্বে ঐ দরজার কাছে পৌঁছেন যাকে ‘বাবে মুহাম্মদ (সঃ) বলা হয়, ওখানে একটি পাথর ছিল যাতে হযরত জিবরাঈল (আঃ) অঙ্গুলি লাগিয়েছিলেন, তখন তাতে ছিদ্র হয়ে যায়। সেখানে তিনি বুরাকটি বাঁধেন এবং এর পর মসজিদে প্রবেশ করেন। মসজিদের মধ্যভাগে পৌঁছলে হযরত জিবরাঈল (আঃ) তাঁকে বলেনঃ “আপনি কি আল্লাহ তাআলার কাছে এই আকাংখা করছেন যে, তিনি আপনাকে হ্র দেখাবেন?” উত্তরে তিনি বলেন, “হ্যা” তিনি তখন বলেনঃ “তা হলে আসুন। এই যে তারা। তাদেরকে সালাম করুন।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তারা সাখরার বাম পার্শ্বে বসেছিল। আমি তাদের কাছে গিয়ে সালাম করলাম। সবাই সালামের জবাব দিলো। আমি জিজ্ঞেস করলামঃ তোমরা কে? উত্তরে তারা বললোঃ “আমরা হলাম চরিত্রবতী সুন্দরী হুর। আল্লাহর পরহেযগার ও নেককার বান্দাদের আমরা স্ত্রী। যারা পাপকার্য থেকে দুরে থাকে এবং যাদেরকে পবিত্র করে আমাদের কাছে আনয়ন করা হবে। অতঃপর আর তারা কখনো বের হবে না। তারা সদা আমাদের কাছেই অবস্থান করবে। আমাদের থেকে কখনো তারা পৃথক হবে না। চিরকাল তারা জীবিত থাকবে, কখনো মৃত্যু বরণ করবেনা।” অতঃপর আমি তাদের নিকট থেকে চলে আসলাম। সেখানে মানুষ জমা হতে শুরু করলো এবং অল্পক্ষণের মধ্যে বহু লোক জমা হয়ে গেল এবং আমরা সবাই দাঁড়িয়ে গেলাম। ইমামতি কে করবেন এজন্যে আমরা অপেক্ষা করছিলাম। এমন সময় হযরত জিবরাঈল (আঃ) আমার হাত ধরে সামনে বাড়িয়ে দিলেন। আমি তাদেরকে নামায পড়ালাম। নামায শেষে হযরত জিবরাঈল (আঃ) আমাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “যাদের আপনি ইমামতি করলেন তাঁরা কে তা জানেন কি? আমি জবাব দিলামঃ না। তখন তিনি বললেনঃ “আপনার এই সব মুকতাদী ছিলেন আল্লাহর নবী যাদেরকে তিনি প্রেরণ করে ছিলেন। তারপর তিনি আমার হাত ধরে অসমানের দিকে নিয়ে চললেন।” এরপর বর্ণনা আছে যে, আকাশের দরজাগুলি খুলিয়ে দেয়া হয়। ফেরেশতাগণ প্রশ্ন করেন, উত্তর পান, দরজা খুলে দেন ইত্যাদি। প্রথম আকাশে হযরত আদমের (আঃ) সাথে সাক্ষাৎ হয়। তিনি বলেনঃ “হে আমার উত্তম পুত্র! (হে উত্তম নবী (সঃ)! আপনার আগমন শুভ হোক।” এতে চতুর্থ আকাশে হযরত ইদরীসের (আঃ) সাথে সাক্ষাৎ হওয়ারও উল্লেখ রয়েছে। সপ্তম আকাশে হযরত ইবরাহীমের (আঃ) সাথে সাক্ষাৎ হওয়া এবং হযরত আদমের (আঃ) মত তাঁরও তাকে উত্তম পুত্র ও উত্তম নবী (সঃ) বলে সম্ভাষণ জানানোর বর্ণনা রয়েছে। তারপর আমাকে (নবী সঃ কে) হযরত জিবরাঈল (আঃ) আরো উপরে নিয়ে গেলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আমি একটি নদী দেখলাম। যাতে মণিমুক্তা, ইয়াকূত ও যবরজদের পানপাত্র ছিল এবং উত্তম ও সুন্দর রঙ-এর পাখী ছিল। আমি বললামঃ এতো খুবই সুন্দর পাখী! আমার একথার জবাবে হযরত জিবরাঈল (আঃ) বললেনঃ “এটা যারা খাবে তারা আরো উত্তম।” অতঃপর তিনি বললেনঃ “এটা কোন নহর তা জানেন কি?” আমি জবাব দিলামঃ “না”। তিনি তখন বললেনঃ “এটা হচ্ছে। নহরে কাওসার। এটা আল্লাহ তাআলা আপনাকে দান করার জন্য রেখেছেন।” তাতে স্বর্ণ ও রৌপ্যের পানপাত্র ছিল যাতে ইয়াকূত ও মণিমাণিক্য জড়ানো ছিল। ওর পানি ছিল দূধের চেয়েও বেশী সাদা। আমি একটি সোনার পেয়ালা নিয়ে তা ঐ পানি দ্বারা পূর্ণ করে পান করলাম। ঐপানি ছিল মধুর চেয়েও বেশী মিষ্ট এবং মিক আম্বারের চেয়েও বেশী সুগন্ধময়। আমি যখন এর চেয়েও আরো উপরে উঠলাম তখন এক অত্যন্ত সুন্দর রঙ-এর মেঘ এসে। আমাকে ঘিরে নিলো, যাতে বিভিন্ন রঙছিল। জিবরাঈল (আঃ) তো আমাকে ছেড়ে দিলেন এবং আমি আল্লাহ তাআলার সামনে সিজদায় পড়ে গেলাম।” অতঃপর পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামায ফরয হওয়ার বর্ণনা রয়েছে। তারপর তিনি ফিরে আসেন। হযরত ইবরাহীম (আঃ) তো কিছুই বললেন না। কিন্তু হযরত মূসা (আঃ) নামায হালকা করবার জন্যে তাঁকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে আল্লাহ তাআলার নিকট ফিরিয়ে পাঠালেন। মোট কথা, অনুরূপভাবে তাঁর মহান আল্লাহর কাছে বারবার যাওয়া, মেঘের মধ্যে পরিবেষ্টিত হওয়া, নামাযের ওয়াক্ত হালকা হয়ে যাওয়া, হযরত ইবরাহীমের (আঃ) সাথে মিলিত হওয়া, হযরত মূসার (আঃ) ঘটনার বর্ণনা দেয়া, শেষ পর্যন্ত পাঁচ ওয়াক্ত নামায থেকে যাওয়া ইত্যাদির বর্ণনা রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “এরপর হযরত জিবরাঈল (আঃ) আমাকে নিয়ে নীচে অবতরণ করেন। আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলামঃ যে সব আকাশে আমি গিয়েছি সেখানকার ফেরেশতাগণ আনন্দ প্রকাশ করেছেন এবং হাসিমুখে আমার সাথে মিলিত হয়েছেন। কিন্তু শুধুমাত্র একজন ফেরেস্তা হাসেন নাই। তিনি আমার সালামের জবাব দিয়েছেন এবং মারহাবা বলে অভ্যর্থনাও জানিয়েছেন বটে, কিন্তু তার মুখে আমি হাসি দেখি নাই। তিনি কে?” আর তার না হাসার কারণই বা কি? উত্তরে তিনি বললেনঃ “তার নাম মালিক। তিনি জাহান্নামের দারোগা। জন্মের পর থেকে আজ পর্যন্ত তিনি কোন হাস্য করেন। নাই এবং কিয়ামত পর্যন্ত হাসবেনও না। কারণ তাঁর খুশীর এটাই ছিল একটা বড় সময়।” ফিরবার পথে আমি কুরায়েশের এক যাত্রী দলকে খাদ্য সম্ভার নিয়ে যেতে দেখলাম। তাদের সাথে এমন একটি উট দেখলাম যার উপর একটি সাদা ও একটি কালো চটের বস্তা ছিল। যখন হযরত জিবরাঈল (আঃ) এবং আমি ওর নিকটবর্তী হলাম তখন সে ভয় পেয়ে পড়ে গেল এবং এর ফলে সে খোঁড়া হয়ে গেল। এভাবে আমাকে আমার স্বস্থানে পৌঁছিয়ে দেয়াহলো।” সকালে তিনি জনগণের সামনে মিরাজের ঘটনাটি বর্ণনা করলেন। মুশরিকরা এ খবর শুনে সরাসরি হযরত আবু বকরের (রাঃ) নিকট গমন করলো এবং তাঁকে বললোঃ “তোমার সঙ্গী কি বলছে শুনেছো কি? সে নাকি আজ রাত্রেই একমাসের পথ ভ্রমণ করে এসেছে।” উত্তরে হযরত আবূ বকর (রাঃ) বললেনঃ “যদি প্রকৃতই তিনি একথা বলে থাকেন তবে তিনি সত্য কথাই বলছেন। এর চেয়ে আরো বড় কথা বললেও তো আমরা তাঁকে সত্যবাদী বলেই জানবো। আমরা জানি যে, তাঁর কাছে মাঝে মাঝে আকাশের খবর এসে থাকে। মুশরিকরা রাসূলুল্লাহকে (সঃ) বললোঃ “তুমি আমাদের কাছে তোমার সত্যবাদিতার কোন প্রমাণ পেশ করতে পার কি?” তিনি জবাবে বললেনঃ “হাঁ, পারি। আমি অমুক অমুক জায়গায় কুরায়েশদের যাত্রীদলকে দেখেছি। তাদের একটি উট, যার উপর সাদা ও কালো দু'টি বস্তা ছিল, আমাদেরকে দেখে উত্তেজিত হয়ে ওঠে এবং চক্কর খেয়ে পড়ে যায়, ফলে তার পা ভেঙ্গে যায়।” ঐ যাত্রীদল আগমন করলে জনগণ তাদেরকে জিজ্ঞেস করেঃ “পথে নতুন কিছু ঘটে ছিল কি?” তারা উত্তরে বললোঃ “হাঁ, ঘটেছিল। অমুক উট উমুক জায়গায় এইভাবে খোঁড়া হয়ে যায় ইত্যাদি।” বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহর (সঃ) মিরাজের ঘটনাকে সত্য বলে স্বীকার করার কারণেও হযরত আবু বকরের (রাঃ) উপাধি হয় সিদ্দীক। জনগণ রাসূলুল্লাহকে (সঃ) জিজ্ঞেস করেঃ “আপনি তো হযরত মূসা (আঃ) ও হযরত ঈসার (আঃ) সাথে সাক্ষাৎ করেছেন, সুতরাং তাদের আকৃতির বর্ণনা দিন তো?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “হাঁ বলছি। হযরত মূসা (আঃ) গোধূম বর্ণের লোক, যেমন ইদে অম্মািনের লোক হয়ে থাকে। আর হযরত ঈসার (আঃ) অবয়ব মধ্যম ধরণের এবং রঙ ছিল কিছুটা লালিমা যুক্ত। তাকে দেখে মনে হচ্ছিল যে, তাঁর চুল দিয়ে যেন পানি। ঝরে পড়ছে।” (এই বর্ণনাতেও অস্বাভাবিকতা ও অদ্ভুত বস্তুনিচয় পরিলক্ষিত হয়) মুসনাদে আহমাদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) শুয়ে ছিলেন (কা’বা শরীফের) হাতীম’ নামক স্থানে। অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, তিনি সখরের উপর শুয়েছিলেন। এমন সময় আগমনকারীরা আগমন করেন। একজন অপরজনকে আদেশ করেন এবং তিনি তাঁর কাছে এসে এখান থেকে এখান। পর্যন্ত বিদীর্ণ করে দেন অর্থাৎ গলার পার্শ্ব থেকে নিয়ে নাভী পর্যন্ত। তারপর উপরে বর্ণিত হাদীসগুলির বর্ণনার মতই বর্ণিত হয়েছে। তাতে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “ষষ্ঠ আকাশে আমি হযরত মূসাকে (আঃ) সালাম করি এবং তিনি সালামের জবাব দেন। অতঃপর বলেনঃ “সৎ ভাই ও সৎ নবীর (সঃ) আগমন শুভ হোক।” আমি সেখান হতে আগে বেড়ে গেলে তিনি কেঁদে ফেলেন। তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলোঃ “আপনি কাঁদছেন কেন?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “এই জন্যে যে, যে ছেলেটিকে আমার পরে নবী করে পাঠান হয়েছে তাঁর উম্মত আমার উম্মতের তুলনায় অধিক সংখ্যক জান্নাতে যাবে।” তাতে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) সিদরাতুল মুনতাহার নিকট চারটি নহর দেখেন। দুটি যাহির ও দুটি বাতিন। তিনি বলেনঃ “আমি বললামঃ হে জিবরাঈল (আঃ)! এই চারটি নহর কি? তিনি উত্তরে বললেনঃ “বাতিনী নহর দু’টি হচ্ছে জান্নাতের নহর এবং যাহিরী নহর দুটি হলো নীল ও ফুরাত।” অতঃপর আমার সামনে বায়তুল মা'মূর’ উঁচু করা হলো। তারপর আমার সামনে মদ, দূধ ও মধুর পাত্র পেশ করা হলো। আমি দূধের পাত্রটি গ্রহণ করলাম। হযরত জিবরাঈল (আঃ) বললেনঃ “এটাই হচ্ছে ‘ফিতরত’ (প্র??

سُبْحَانَ الَّذِي أَسْرَى بِعَبْدِهِ لَيْلًا مِنَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ إِلَى الْمَسْجِدِ الْأَقْصَى الَّذِي بَارَكْنَا حَوْلَهُ لِنُرِيَهُ مِنْ آيَاتِنَا إِنَّهُ هُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ ﴿١﴾

( سورة: আল-ইসরা آية: 1 )

তাফসিরে ইবন কাসির এর আরবি মূল পাঠ এখানে থাকবে।

তাফসিরে তাবারি লোড হচ্ছে...

তাফসিরে কুরতুবি লোড হচ্ছে...

তাফসিরে বাগাবি লোড হচ্ছে...

তাফসিরে সা'দি লোড হচ্ছে...

তাফসিরে জাকারিয়া লোড হচ্ছে...

আহসানুল বায়ান লোড হচ্ছে...

ফাতহুল মাজীদ লোড হচ্ছে...