مُذَبْذَبِينَ بَيْنَ ذَلِكَ لَا إِلَى هَؤُلَاءِ وَلَا إِلَى هَؤُلَاءِ وَمَنْ يُضْلِلِ اللَّهُ فَلَنْ تَجِدَ لَهُ سَبِيلًا ﴿١٤٣﴾
( সুরাঃ আন-নিসা আয়াতঃ 143 )
১৪২-১৪৩ নং আয়াতের তাফসীর: সূরা-ই-বাকারার প্রথমেও (আরবী) (২:৯) -এ আয়াতটির তাফসীর বর্ণিত হয়েছে। এখানেও বর্ণনা করা হচ্ছে যে, এ নির্বোধ মুনাফিকরা আল্লাহ তাআলার সাথে প্রতারণা করতে রয়েছে, অথচ তিনি তাদের অন্তরের সমস্ত কথা সম্যক অবগত রয়েছেন। স্বল্প বুদ্ধির কারণে এ মুনাফিকরা মনে করে নিয়েছে যে, তাদের কপটতা যেমন দুনিয়ায় চলছে এবং মুসলমানদের মধ্যে চলছে, তদ্রুপ কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলার সমীপেও চলবে। যেমন কুরআন পাকে রয়েছে-কিয়ামতের দিনেও এরা আল্লাহ তাআলার সম্মুখে শপথ করে বলবে যে, তারা সত্যের উপরেই প্রতিষ্ঠিত ছিল, যেমন আজ তারা তোমাদের সামনে শপথ করে বলছে। কিন্তু সেই সর্বজ্ঞাতা আল্লাহর সামনে তাদের এ বাজে শপথে কোনই কাজ দেবে না। আল্লাহ তাআলাও তাদেরকে প্রতারণা প্রত্যার্পণকারী। তিনি তাদেরকে অবকাশ দিচ্ছেন। তাই তারা আজ বেড়ে চলেছে ও ফুলে উঠেছে এবং এটাকে তাদের জন্যে মঙ্গলজনক মনে করেছে। কিয়ামতের দিনেও তাদের অবস্থা এমনই হবে। তারা মুসলমানদের আলোকের উপর নির্ভর করে থাকবে। মুসলমানেরা সামনে এগিয়ে যাবে। এ মুনাফিকরা তখন তাদেরকে ডাক দিয়ে বলবে-তোমরা থাম, আমরা তোমাদের আলোকের সাহায্যে চলতে থাকি। মুসলমানেরা তখন উত্তর দেবে-তোমরা পিছনে ফিরে যাও এবং আলো অনুসন্ধান কর। তারা পিছনে ফিরবে এমন সময় তাদের মধ্যে পর্দা পড়ে যাবে। মুসলমানদের দিকে থাকবে করুণা এবং তাদের দিকে থাকবে দুঃখ ও বেদনা। হাদীস শরীফে রয়েছে, যে ব্যক্তি শুনাবে আল্লাহ তা'আলা সেটা শুনিয়ে দেবেন এবং যে রিয়াকারী করবে আল্লাহ তা'আলা সেটা দেখিয়ে দেবেন। অন্য হাদীসে রয়েছে যে, ঐ মুনাফিকদের মধ্যে এমন লোকও হবে যাদের সম্পর্কে বাহ্যতঃ লোকের সামনে আল্লাহ তা'আলা জান্নাতে নিয়ে যাবার নির্দেশ দেবেন। ফেরেশতাগণ তখন তাদেরকে নিয়ে গিয়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন। আল্লাহ পাক আমাদেকে ওটা হতে রক্ষা করুন। আল্লাহ তা'আলা বলেন-'যখন তারা নামাযের জন্যে দণ্ডায়মান হয় তখন তারা শৈথিল্যের সাথে দণ্ডায়মান হয়। অর্থাৎ নামাযের মত উত্তম ইবাদত তারা একাগ্রচিত্তে ও আন্তরিকতার সাথে আদায় করে না। কেননা সত্য নিয়ত, উত্তম আমল, প্রকৃত ঈমান এবং সত্য বিশ্বাস তাদের মধ্যে মোটেই নেই। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) পরিশ্রান্ত দেহে ছটফট করা অবস্থায় নামায পড়াকে মাকরূহ মনে করতেন এবং বলতেনঃ মানুষের উচিত যে, সে যেন পূর্ণ আগ্রহ ও একাগ্রতার সাথে নামাযে দণ্ডায়মান হয় এবং এ বিশ্বাস রাখে যে, তার কথার উপর আল্লাহর কান রয়েছে। তিনি তার আকাঙ্খা পুরো করার জন্যে সদা প্রস্তুত রয়েছেন। এ তো হলো মুনাফিকদের বাহ্যিক অবস্থা যে তারা পরিশ্রান্ত দেহে ও সংকীর্ণ অন্তরে বেগার পরিশোধের নামাযের জন্যে আগমন করে। আর তাদের আভ্যন্তরীণ অবস্থা এই যে, আন্তরিকতা হতে বহু দূরে রয়েছে। তারা প্রভুর সঙ্গে কোন সম্পর্ক রাখে না। তারা শুধু মানুষের মধ্যে নামাযী রূপে পরিচিত হবার জন্যে এবং নিজেদের ঈমান প্রকাশ করার উদ্দেশ্যে নামায পড়ে থাকে। তাহলে এ অস্থিরচিত্ত মানুষেরা নামাযে কি পাবে? এ কারণেই তারা ঐ নামাযে অনুপস্থিত থাকে যে নামাযে মানুষ একে অপরকে দেখতে কম পায়। যেমন ইশা ও ফজরের নামায। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ মুনাফিকদের উপর সবচেয়ে ভারী নামায হচ্ছে ইশা ও ফজরের নামায। যদি তারা এ নামাযের ফযীলতের কথা অন্তরে বিশ্বাস করতো তবে জানুর ভরে চলে হলেও অবশ্যই এ নামাযে হাযির হতো। কাজেই আমি তখন ইচ্ছে করি যে, তাকবীর বলিয়ে দিয়ে কাউকে ইমামতির স্থানে দাঁড় করতঃ নামায আরম্ভ করিয়ে দেই, অতঃপর আমি গিয়ে লোকদেরকে বলি যে তারা যেন জ্বালানী কাষ্ঠ নিয়ে এসে ঐ লোকদের বাড়ীর চতুর্দিকে রেখে দিয়ে আগুন জ্বালিয়ে দেয় এবং তাদের ঘর বাড়ী পুড়িয়ে দেয় যারা জামাআতে হাজির হয় না। অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহর শপথ! যদি তাদের একটি চর্বিযুক্ত অস্থি বা দু'টি উত্তম (পশ্বাদির) খুর পাওয়ার আশা থাকতো তবে তারা দৌড়ে চলে আসতো। কিন্তু তাদের নিকট আখিরাতের এবং আল্লাহ প্রদত্ত পুণ্যের ওর সমানও মর্যাদা নেই। বাড়ীতে যেসব স্ত্রীলোক ও শিশু অবস্থান করে তাদের খেয়াল যদি আমার না থাকতো তবে অবশ্যই আমি তাদের ঘর-বাড়ী জ্বালিয়ে দিতাম। মুসনাদ-ই-আবি ইয়ালায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি লোকদের উপস্থিতির সময় তো নামাযকে সুন্দরভাবে থেমে থেমে আদায় করে কিন্তু যখন কেউ থাকে না তখন যেন-তেনভাবে পড়ে নেয়, সে ঐ ব্যক্তি যে স্বীয় প্রভুর প্রতি অবজ্ঞা প্রকাশ করে। আল্লাহর তা'আলা বলেন-তারা আল্লাহকে খুব কমই স্মরণ করে থাকে। অর্থাৎ নামায়ে তাদের মোটেই মন বসে না। তারা যে কথা বলে তা নিজেই বুঝে না বরং তারা উদাসীনভাবে নামায পড়ে থাকে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ওটা মুনাফিকের নামায যে ব্যক্তি বসে বসে সূর্যের দিকে তাকাতে রয়েছে, অবশেষে ওটা অস্তমিত হতে চলেছে এবং শয়তানের শৃংগদ্বয়ের মধ্যে হয়ে গেছে সে সময় সে উঠে পড়ে এবং তাড়াতাড়ি চার রাকআত নামায আদায় করে নেয় যার মধ্যে আল্লাহর যিকির নামেমাত্র করে থাকে।' (সহীহ মুসলিম ইত্যাদি) এ মুনাফিক সদা স্তম্ভিত ও হতভম্ব অবস্থায় কালাতিপাত করে। ঈমান ও কুফরীর মধ্যে তাদের মন অস্থির থাকে। তারা না স্পষ্টভাবে মুসলমানদের সঙ্গী, না সম্পূর্ণরূপে কাফিরদের সাথী। কখনও ঈমানের জ্যোতি অন্তরে পরিস্ফুট হয়ে উঠলে তারা ইসলামের সত্যতা স্বীকার করতে থাকে। আবার কখনও কুফরীর অন্ধকার তাদের উপর জয়যুক্ত হলে তারা ঈমান হতে দূরে সরে পড়ে। না তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহাবীদের দিকে রয়েছে, না ইয়াহূদীদের পক্ষে রয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ মুনাফিকের অবস্থা হচ্ছে দু'টি পালের মধ্যস্থিত ছাগলের অবস্থার ন্যায় যা ভ্যা-ভ্যা করতে করতে কখনও এ পালের দিকে দৌড় দেয় এবং কখনও ঐপালের দিকে দৌড় দেয়। সে এখনও স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারেনি যে, এর পিছনে যাবে কি ওর পিছনে যাবে। একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, এ অর্থের হাদীসটি হযরত উবায়েদ ইবনে উমায়ের (রাঃ) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ)-এর উপস্থিতিতে শব্দের কিছু হেরফের করে বর্ণনা করলে তিনি নিজ কানে শুনা শব্দগুলোর পুনরাবৃত্তি করতঃ বলেন যে, সেরূপ নয়, বরং প্রকৃত হাদীস হচ্ছে এরূপ।' এতে হযরত উবায়েদ ইবনে উমায়ের (রাঃ) অসন্তুষ্ট হন। ‘মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন যে, মুমিন, কাফির এবং মুনাফিকের উপমা হচ্ছে ঐ তিনটি লোকের ন্যায় যারা একটি নদীর তীরে উপস্থিত হয়েছে। একজন তীরেই দাঁড়িয়ে রয়েছে, দ্বিতীয়জন নদী অতিক্রম করতঃ গন্তব্যস্থানে পৌঁছে গেছে এবং তৃতীয় ব্যক্তি নদীতে নেমে পড়েছে। যখন সে নদীর মধ্যস্থলে * পৌছেছে তখন এ তীরের লোকটি তাকে ডাক দিয়ে বলছে- ‘ধ্বংস হতে কোথায় চলেছে এ তীরে ফিরে এসো।' আবার ঐ তীরের লোকটি তাকে ডাক দিয়ে বলছে-এ তীরে চলে এসো, মুক্তি পেয়ে যাবে এবং আমার মত গন্তব্যস্থলে পৌঁছতে পারবে, অর্ধেক পথতো অতিক্রম করেই ফেলেছে। এখন সে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে একবার এদিকে দেখে এবং একবার ওদিকে দেখে। এ দোদুল্যমান অবস্থায় সে রয়েছে এমন সময় একটি বিরাট তরঙ্গ এসে তাকে ভাসিয়ে নেয় এবং অবশেষে সে নদীতে নিমজ্জিত হয়ে প্রাণ হারিয়ে ফেলে। অতএব নদী অতিক্রমকারী হচ্ছে মুসলমান, তীরে দণ্ডায়মান ব্যক্তি হচ্ছে কাফির এবং ডুবে মৃত্যুবরণকারী ব্যক্তি হচ্ছে মুনাফিক। অন্য হাদীসে রয়েছে যে, মুনাফিকের উপমা হচ্ছে ঐ ছাগলটির ন্যায় যে একটি সবুজ শ্যামল পাহাড়ের উপর গুটিকয়েক ছাগল দেখে তথায় আসে এবং শুঁকে চলে যায়। তারপরে আর একটি পাহাড়ের উপর উঠে এবং শুঁকে চলে আসে। এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-“আল্লাহ যাকে পথভ্রান্ত করেছেন, তার পথ প্রদর্শক আর কে আছে? আল্লাহ তাআলা মুনাফিকদেরকে তাদের জঘন্য কার্যের কারণে সঠিক পথ হতে ধাক্কা দিয়ে দূরে নিক্ষেপ করেছেন। এখন আর কেউ তাকে সঠিক পথের উপর আনতেও পারবে না এবং তার মুক্তির ব্যবস্থাও করতে পারবে না। আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছের বিপরীত কাজ কেউ করতে পারবে না। তিনি সকলেরই শাসনকর্তা। তার উপর কারও শাসন ক্ষমতা নেই।
তাফসিরে তাবারি লোড হচ্ছে...
তাফসিরে কুরতুবি লোড হচ্ছে...
তাফসিরে বাগাবি লোড হচ্ছে...
তাফসিরে সা'দি লোড হচ্ছে...
তাফসিরে জাকারিয়া লোড হচ্ছে...
আহসানুল বায়ান লোড হচ্ছে...
ফাতহুল মাজীদ লোড হচ্ছে...