يَوْمَ تَشْهَدُ عَلَيْهِمْ أَلْسِنَتُهُمْ وَأَيْدِيهِمْ وَأَرْجُلُهُمْ بِمَا كَانُوا يَعْمَلُونَ ﴿٢٤﴾
যেদিন তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে তাদের জিহবা, তাদের হাত, তাদের পা- তাদের কৃতকর্মের ব্যাপারে। ( সুরাঃ আন-নূর আয়াতঃ 24 )
২৩-২৫ নং আয়াতের তাফসীর যারা সাধারণ সতী সাধ্বী, সরলমনা ও মুমিনা নারীর প্রতি অপবাদ আরোপ করে তাদেরকে এখানে ভীতি প্রদর্শন করা হচ্ছে। তাদেরই শাস্তি যদি এরূপ হয় তবে যারা নবী (সঃ)-এর স্ত্রী মুসলমানদের মাতাদের প্রতি অপবাদ আরোপ করে থাকে তাদের শাস্তি কি হতে পারে? বিশেষ করে ঐ স্ত্রীর উপর, যিনি হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর কন্যা ছিলেন। উলামায়ে কিরামের এর উপর ইজমা রয়েছে যে, এই আয়াতগুলো অবতীর্ণ হওয়ার পরেও যে ব্যক্তি হযরত আয়েশা (রাঃ)-কে অপবাদের সাথে স্মরণ করে সে কাফির। কেননা, সে কুরআন কারীমের বিরুদ্ধাচরণ করলো। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অন্যান্য স্ত্রীদের ব্যাপারেও সঠিক উক্তি এটাই যে, তাঁরাও হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাঃ)-এর মতই। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের অধিকারী। মহান আল্লাহ বলেনঃ তারা দুনিয়া ও আখিরাতে অভিশপ্ত এবং তাদের জন্যে আছে মহাশাস্তি। যেমন তার উক্তি অন্য জায়গায় রয়েছে (আরবি) অর্থাৎ “নিশ্চয়ই যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-কে কষ্ট দেয়।” (৩৩: ৫৭)। কারো কারো ধারণা এই যে, এটা বিশেষভাবে হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এ কথাই বলেন। সাঈদ ইবনে জুবাইর (রঃ) এবং মুকাতিল ইবনে হাইয়ান (রঃ)-এরও এটাই উক্তি। (ইমাম ইবনে জারীরও (রঃ) হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে এটা বর্ণনা করেছেন) অতঃপর তিনি যে বিস্তারিত রিওয়াইয়াত আনয়ন করেছেন তাতে হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর প্রতি অপবাদ আরোপ করা, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর প্রতি অহী আসা এবং এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার বর্ণনা রয়েছে। কিন্তু এই হুকুম হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর সঙ্গে বিশিষ্ট হওয়ার কথা বর্ণনা করা হয়নি। সুতরাং অবতীর্ণ হওয়ার কারণ বিশিষ্ট হলেও এর হুকুম সাধারণ। হতে পারে যে, হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) প্রমুখ গুরুজনের উক্তিরও ভাবার্থ এটাই। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। কোন কোন মনীষী বলেন যে, সমস্ত পবিত্র স্ত্রীর হুকুম এটাই বটে, কিন্তু মুমিনা স্ত্রীলোকদের হুকুম এটা নয়। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এই আয়াত দ্বারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর স্ত্রীগণ উদ্দেশ্য, এই অপবাদে যেসব মুনাফিক অংশ নিয়েছিল তারা সবাই অভিশপ্ত সাব্যস্ত হয় এবং আল্লাহর ক্রোধের কোপানলে পতিত হয়। এর পরে মুমিনা স্ত্রীলোকদের উপর অপবাদ আরোপকারীদের হুকুম হিসেবে (আরবি) এই আয়াত অবতীর্ণ হয়। সুতরাং তাদেরকে চাবুক মারা হবে। তারা তাওবা করলে তাদের তাওবা কবুল করা হবে। কিন্তু তাদের সাক্ষ্য তখন থেকে নিয়ে চিরদিনের জন্যে অগ্রাহ্য হবে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) একবার সূরায়ে নূরের তাফসীর বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন যে, এই আয়াতটি রাসূলল্লাহ (সঃ)-এর স্ত্রীদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। ঐ অপবাদ আরোপকারীদের তাওবা গৃহীত নয়। এ আয়াতটি অস্পষ্ট। আর চারজন সাক্ষী আনতে না পারার আয়াতটি সাধারণ ঈমানদার স্ত্রীলোকদের উপর অপবাদ আরোপকারীদের ব্যাপারে প্রযোজ্য। তাদের তাওবা গৃহীত। তাঁর এ কথা শুনে সভার লোকদের ইচ্ছা হলো যে, তারা তাঁর কপাল চুম্বন করবে। কেননা, তিনি খুবই উত্তম তাফসীর করেছিলেন। ইবহাম বা অস্পষ্ট দ্বারা উদ্দেশ্য এই যে, অপবাদের অবৈধতা সাধারণ। এটা প্রত্যেক সতী-সাধ্বী স্ত্রীলোকের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। আর এসব অপবাদ আরোপকারীদের সবাই অভিশপ্ত। হযরত আবদুর রহমান (রাঃ) বলেন যে, প্রত্যেক অপবাদ রচনাকারী এই হুকুমের অন্তর্ভুক্ত, কিন্তু হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর ব্যাপারে এই হুকুম আরো বেশী প্রযোজ্য। ইমাম ইবনে জারীরও (রঃ) সাধারণত্বকেই পছন্দ করেন এবং এটাই সঠিকও বটে। সাধারণত্বের পৃষ্ঠপোষকতায় নিম্নের হাদীসটিও রয়েছেঃ হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “সাতটি ধ্বংসকারী পাপ থেকে তোমরা বেঁচে থাকো।” জিজ্ঞেস করা হলোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ঐগুলো কি?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “ঐগুলো হলোআল্লাহর সাথে শিরক করা, যাদু করা, বিনা কারণে কাউকেও হত্যা করা, সুদ খাওয়া, ইয়াতীমের মাল আত্মসাৎ করা, জিহাদের ময়দান থেকে পলায়ন করা এবং সতী-সাধ্বী, সরলা মুমিনা স্ত্রীলোকের উপর অপবাদ আরোপ করা।” (ইবনে আবি হাতিম (রঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) হাদীসটি তাখরীজ করেছেন) হযরত হুযাইফা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “সতী-সাধ্বী স্ত্রীলোকের উপর ব্যভিচারের অপবাদ আরোপকারীর একশ বছরের পুণ্য নষ্ট হয়ে যায়।” (এ হাদীসটি হাফিয আবুল কাসিম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন) হযরত সাঈদ ইবনে জুবাইর (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত ইবনে। আব্বাস (রাঃ) বলেছেনঃ “মুশরিকরা যখন দেখবে যে, জান্নাতে নামাযীরা ছাড়া আর কেউই প্রবেশ করে না তখন তারা তাদের শিরকের কথা অস্বীকার করে বসবে। তৎক্ষণাৎ তাদের মুখের উপর মোহর মেরে দেয়া হবে এবং তাদের হাত-পা তাদের বিরুদ্ধে তখন সাক্ষ্য দিতে শুরু করবে। কাজেই তারা আল্লাহর কাছে কোন কথাই গোপন করতে পারবে না।" (এটা ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন) হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেন, কাফিরদের সামনে যখন তাদের মন্দ কার্যাবলী পেশ করা হবে তখন তারা ঐগুলোকে অস্বীকার করে বসবে এবং নিজেদেরকে নিস্পাপ বলবে। তখন। তাদেরকে বলা হবে-“এরা হলো তোমাদের প্রতিবেশী। এরা তোমাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিচ্ছে। তারা বলবেঃ “এরা মিথ্যাবাদী।” আবার তাদেরকে বলা হবে-“এরা তোমাদের পরিবার ও গোত্রের লোক। এরা তোমাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দান করছে। তারা জবাবে বলবেঃ “এরাও সব মিথ্যাবাদী।" তখন তাদেরকে বলা হবে- “আচ্ছা, তাহলে তোমরা শপথ কর।" তারা তখন শপথ করবে। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে মূক বা বোবা করে দিবেন এবং তাদের হাত ও পা তাদের দুস্কার্যাবলীর সাক্ষ্য দেবে। ফলে তাদেরকে জাহান্নামে প্রবিষ্ট করা হবে। (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন। ইমাম ইবনে জারীরও (রঃ) স্বীয় তাফসীরে এটা বর্ণনা করেছেন) হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, (একদা) আমরা নবী (সঃ)-এর নিকট হাযির ছিলাম এমন সময় তিনি হেসে ওঠেন। অতঃপর তিনি বলেনঃ “আমি কেন হাসলাম তা তোমরা জান কি?" আমরা উত্তরে বললামঃ আল্লাহ এবং তার রাসলই (সঃ) ভাল জানেন। তিনি তখন বলেন, কিয়ামতের দিন বান্দা প্রতিপালকের সাথে বিতর্কে লিপ্ত হবে। সে বলবেঃ “হে আমার প্রতিপালক! আপনি কি আমাকে যুলুম হতে বিরত রাখেননি?” আল্লাহ তা'আলা উত্তরে বলবেনঃ “হা।" সে বলবেঃ “আচ্ছা, আজ আমি যে সাক্ষীকে সত্যবাদীরূপে মেনে নিবো তার সাক্ষ্যই আমার ব্যাপারে বিশ্বাসযোগ্য হবে এবং ঐ সাক্ষী আমি নিজেই, আর কেউ নয়। আল্লাহ তা'আলা বলবেনঃ “আচ্ছা ঠিক আছে। তুমি নিজেই তোমার সাক্ষী থাকো।” অতঃপর তার মুখে মোহর লাগিয়ে দেয়া হবে এবং তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলোকে প্রশ্ন করা হবে, আর ওগুলো তার সবকিছুই প্রকাশ করে দেবে। সে তখন তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলোকে বলবেঃ “তোমরা ধ্বংস হও। তোমাদের পক্ষ থেকেই তো আমি বিতর্কে লিপ্ত হয়েছিলাম।” (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ), ইমাম মুসলিম (রঃ) এবং ইমাম নাসাঈ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এ হাদীসটি গারীব বা দুর্বল। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন) হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন, হে আদম সন্তান! তুমি নিজেই তোমার মন্দ কার্যাবলীর সাক্ষী। তোমার দেহের সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ তোমার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে। তুমি এর খেয়াল রাখবে। তুমি প্রকাশ্য কার্যে ও গোপনীয় কার্যে আল্লাহকে ভয় করবে। আল্লাহর কাছে কোন কিছুই গোপন নেই। অন্ধকার তার সামনে আলোকময় থাকে এবং গোপনীয় বিষয় থাকে তার কাছে প্রকাশমান। আল্লাহর সাথে ভাল ধারণা রাখা অবস্থায় মৃত্যুবরণ কর। আল্লাহ ছাড়া আমাদের কোনই ক্ষমতা নেই। এখানে দ্বীন দ্বারা হিসাব বুঝানো হয়েছে। জমহূরের কিরআতে (আরবি)-এর উপর যবর রয়েছে, কেননা, ওটা (আরবি)-এর (আরবি) বা বিশেষণ। মুজাহিদ (রঃ) (আরবি) পড়েছেন। এই হিসেবে (আরবি) এর (আরবি) হবে। হযরত উবাই ইবনে কা'ব (রাঃ)-এর মাসহাফে পূর্বযুগীয় কোন কোন গুরুজন হতে (আরবি) এই রূপ পড়াও বর্ণিত আছে। ঐ সময় মানুষ জানতে পারবে যে, আল্লাহর ওয়াদা অঙ্গীকার ও ভীতি-প্রদর্শন সবই সত্য। হিসাব গ্রহণে তিনি ন্যায়বান এবং যুলুম হতে তিনি বহুদূরে। হিসাব গ্রহণের ব্যাপারে তিনি বান্দার উপর তিল পরিমাণও যুলুম করবেন না।
তাফসিরে তাবারি লোড হচ্ছে...
তাফসিরে কুরতুবি লোড হচ্ছে...
তাফসিরে বাগাবি লোড হচ্ছে...
তাফসিরে সা'দি লোড হচ্ছে...
তাফসিরে জাকারিয়া লোড হচ্ছে...
আহসানুল বায়ান লোড হচ্ছে...
ফাতহুল মাজীদ লোড হচ্ছে...