قُلْ أَمَرَ رَبِّي بِالْقِسْطِ وَأَقِيمُوا وُجُوهَكُمْ عِنْدَ كُلِّ مَسْجِدٍ وَادْعُوهُ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ كَمَا بَدَأَكُمْ تَعُودُونَ ﴿٢٩﴾
বল, ‘আমার প্রতিপালক ন্যায়পরায়ণতার নির্দেশ দিয়েছেন’, আর প্রত্যেক সলাতে তোমাদের লক্ষ্য ও মনোযোগকে (তাঁর প্রতি) নিবদ্ধ কর, তাঁর আনুগত্যে বিশুদ্ধ-চিত্ত হয়ে তাঁকে ডাক। যেভাবে তোমাদেরকে প্রথমে সৃষ্টি করা হয়েছে (তোমাদের মৃত্যুর পর আবার জীবিত হয়ে) সেভাবেই তোমরা ফিরে আসবে। ( সুরাঃ আল-আ'রাফ আয়াতঃ 29 )
২৮-৩০ নং আয়াতের তাফসীর: আরবের মুশরিকরা উলঙ্গ হয়ে কা'বার তাওয়াফ করতো এবং বলতোঃ “জন্মের সময় আমরা যেমন ছিলাম তেমনভাবেই আমরা তাওয়াফ করবো।” স্ত্রীলোকেরা কাপড়ের পরিবর্তে চামড়ার কোন ছোট অংশ বা অন্য কোন বস্তু লজ্জাস্থানে বেঁধে নিতে এবং দেহের অবশিষ্ট অংশগুলো উলঙ্গই থাকতো। তাদেরকে বলা হতো- আজ দেহের কিছু অংশ অথবা সম্পূর্ণ অংশ খোলা রাখা হবে। কিন্তু যে অংশই খোলা থাকবে তা কারো জন্যে হালাল নয়। তখন আল্লাহ তাআলা এই আয়াত অবতীর্ণ করেনঃ “এই লোকগুলো যখন কোন লজ্জাজনক কাজ করে তখন বলে-আমরা আমাদের বাপ-দাদাদেরকে এরূপই করতে দেখেছি এবং আল্লাহর নির্দেশ এটাই।” কুরাইশরা ছাড়া সারা আরববাসী তাদের দিন ও রাত্রির পোশাক পরিধান করে তাওয়াফ করতো না এবং এর কারণ বর্ণনা করতো যে, যে কাপড় পরিধান করে তারা পাপ কাজ করেছে, সে কাপড় পরে কি করে তারা তাওয়াফ করতে পারে? কিন্তু কুরাইশ গোত্র কাপড় পরেই কাবাঘর প্রদক্ষিণ করতো। স্ত্রীলোকেরাও প্রায় উলঙ্গ হয়েই তাওয়াফ করতো এবং তারা তাওয়াফ করতো রাত্রে। এগুলো তারা নিজেদের পক্ষ থেকেই আবিষ্কার করে নিয়েছিল এবং পূর্বপুরুষদের অনুসরণ করছিল। তাদের বিশ্বাস ছিল এই যে, তাদের পূর্বপুরুষদের এই কাজগুলো আল্লাহ তা'আলার হুকুমের ভিত্তিতেই ছিল। তাই মহান আল্লাহ তাদের এ দাবী খণ্ডন করে বলেনঃ হে মুহাম্মাদ (সঃ)! তাদেরকে বলে দাও- তোমরা যে বেহায়াপনা, অশ্লীল ও অশোভনীয় কাজে লিপ্ত রয়েছে, আল্লাহ এ ধরনের কাজের কখনও হুকুম দেন না। তোমরা এমন বিষয়ে আল্লাহকে সম্বন্ধযুক্ত করছো যে বিষয়ে তোমাদের কোনই জ্ঞান নেই। হে নবী (সঃ)! তুমি ঘোষণা করে দাও- আমার প্রভু ন্যায় প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দিয়ে থাকেন এবং তিনি এই নির্দেশও দেন যে, তোমরা তাঁর ইবাদতের সময় তোমাদের মুখমণ্ডলকে স্থির রাখবে। এতেই রয়েছে রাসূলদের আনুগত্য, যারা আল্লাহর শয়ীয়ত পেশ করেছেন এবং মু'জিযা প্রদর্শন করে জোর দিয়ে বলেছেনঃ “এখন মনের বিশুদ্ধতা আনয়ন কর এবং যে পর্যন্ত এ দুটো অর্থাৎ শরীয়তের অনুসরণ ও ইবাদতে বিশুদ্ধ অন্তঃকরণ না হবে সে পর্যন্ত তোমাদের ইবাদত গৃহীত হবে না। আল্লাহ তাআলার (আরবী) উক্তির অর্থের ব্যাপারে মুফাসসিরদের মধ্যে মতানৈক্য রয়েছে। অর্থাৎ মৃত্যুর পরে তিনি পুনর্জীবিত করবেন। তিনি দুনিয়ায় সৃষ্টি করেছেন এবং পরকালে উঠাবেন। যখন তোমরা কিছুই ছিলে না তখন তিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তোমরা মরে যাবে, এরপর তোমাদেরকে তিনি পুনর্জীবিত করবেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) ওয়ায ও নসীহত করার জন্যে দাঁড়ালেন এবং জনগণকে সম্বোধন করে বললেনঃ “হে লোক সকল! তোমরা (কিয়ামতের দিন) উলঙ্গ ও খত্না না করা অবস্থায় উত্থিত হবে। কেননা, তোমরা জন্মগ্রহণের সময় এই রূপই ছিলে। এটা আমাদের উপর ফরয। যদি আমাদেরকে করতে হয় তবে এটাই করবো।” মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে- মুসলমানকে মুসলমান অবস্থায় এবং কাফিরকে কাফির অবস্থায় উঠানো হবে। আবুল আলিয়া (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হচ্ছে - আল্লাহর ইলম অনুযায়ী কিংবা যেরূপ তোমাদের আমল ছিল সে অনুযায়ী তোমরা উখিত হবে। মুহাম্মাদ ইবনে কা'ব (রঃ)-এর ধারণায় এর অর্থ হচ্ছে- যদি কারো জন্ম হয় দুর্ভাগ্যের উপর তবে তাকে দুর্ভাগা অবস্থায় এবং যদি সৌভাগ্যের উপর তার জন্ম হয়ে থাকে তবে ভাগ্যবান অবস্থায় সে উখিত হবে। যেমন হযরত মূসা (আঃ)-এর আমলের যাদুকরগণ সারা জীবন ধরে পাপিষ্ঠদের আমল করতে রয়েছিল, কিন্তু মানবের সৃষ্টি সৌভাগ্যের ভিত্তির উপর হয়েছিল বলেই ঐ ভিত্তির উপরই তার উত্থান হবে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, আল্লাহ তা'আলা কাউকে মুমিন করে এবং কাউকে কাফির করে সৃষ্টি করেছেন। যেমন তিনি বলেছেন- (আরবী) অর্থাৎ “তিনিই আল্লাহ যিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন, তোমাদের মধ্যে কেউ কাফির এবং কেউ মুমিন।” (৬৪:২)। “যেভাবে তোমাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে তেমনিভাবে তোমরা ফিরে আসবে।” আল্লাহ পাকের এই উক্তিরই সহায়ক হচ্ছে হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) বর্ণিত সহীহ বুখারীর নিম্নের হাদীসটি – রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহর শপথ! কোন লোক জান্নাতীদের আমল করতে থাকে এমন কি তার ও জান্নাতের মধ্যে মাত্র এক গজের ব্যবধান থেকে যায়। এমতাবস্থায় তকদীরের লিখন তার উপর জয়যুক্ত হয়ে যায়, ফলে সে জাহান্নামীদের আমল করতে শুরু করে এবং ওর উপরই মৃত্যুবরণ করে। সুতরাং সে জাহান্নামে প্রবেশ করে। পক্ষান্তরে কোন লোক সারা জীবন ধরে জাহান্নামীদের আমল করতে থাকে এবং জাহান্নাম হতে মাত্র এক গজ দূরে অবস্থান করে। এমন সময় আল্লাহর লিখন তার উপর জয়যুক্ত হয়, ফলে সে জান্নাতীদের আমল শুরু করে দেয় এবং ঐ অবস্থাতেই মারা গিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) আরও বলেছেনঃ “কোন লোকের আমল জনগণের দৃষ্টিতে জান্নাতীদের আমলরূপে পরিদৃষ্ট হয়, অথচ প্রকৃতপক্ষে সে জাহান্নামের অধিবাসী। অন্য একটি লোকের আমল জাহান্নামীদের আমলরূপে পরিলক্ষিত হয়, অথচ প্রকৃতপক্ষে সে জান্নাতের অধিবাসী।” সনদ বা দলীল তো হবে ঐ আমল যা শেষ সময়ে প্রকাশ পাবে এবং কালেমায়ে শাহাদাতের উপর প্রাণবায়ু নির্গত হবে। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ “মৃত্যুর সময় যেমন ছিল তেমনিভাবেই উথিত হবে।” এখন এই উক্তি ও (আরবী) এই আয়াতের মধ্যে সামঞ্জস্য স্থাপিত হওয়া জরুরী। আল্লাহ পাকের উক্তির পৃষ্ঠপোষকতায় নিম্নের হাদীসটিও রয়েছে- রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “প্রত্যেকটি শিশু ইসলামী স্বভাবের উপর জন্মগ্রহণ করে থাকে। কিন্তু তার পিতামাতাই তাকে ইয়াহুদী, খ্রীষ্টান এবং মজুসী (অগ্নিপূজক) বানিয়ে থাকে।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) আরও বলেছেন- আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “আমি আমার বান্দাদেরকে তো সৎ স্বভাবের উপরই সৃষ্টি করেছিলাম, কিন্তু শয়তানরাই তাদেরকে বিভ্রান্ত করে দ্বীন থেকে সরিয়ে দিয়েছে। মোটকথা, সামঞ্জস্য বিধানের উপায় হচ্ছে এইরূপঃ আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে এমনভাবে সৃষ্টি করেছেন যে, প্রথমে তো তারা মুমিনই হবে। কারণ, তাদের স্বভাবের মধ্যেই ঈমান রয়েছে। আবার তকদীরে এটাও লিপিবদ্ধ রয়েছে যে, পরে তারা কাফির হয়ে যাবে। যদিও সমস্ত মাখলুকের মধ্যে মারেফাত ও তাওহীদের স্বভাব রয়েছে, যেমন তাদের নিকট থেকে এরূপ অঙ্গীকারও নেয়া হয়েছিল এবং ওটাকে তাদের। স্বাভাবিক জিনিস বানানো হয়েছিল, তথাপি তাদের তকদীরে এটা লিখিত ছিল যে, তারা পাপিষ্ঠ হবে অথবা পুণ্যবান হবে। অন্য হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)বলেছেনঃ “মানুষ সকালে উঠে হয় তো বা স্বীয় প্রাণকে মুক্তির হাতে সোপর্দ করে, নয়তো ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়।” তার মুক্তিতে আল্লাহরই হুকুম প্রকাশ পায়। তিনিই আল্লাহ, (আরবী) অর্থাৎ যিনি এই মীমাংসা করে দিয়েছেন যে, সে হিদায়াত প্রাপ্ত হবে। (৮৭:৩) (আরবী) অর্থাৎ যিনি প্রত্যেক জিনিসকে ওর ‘খলকত' প্রদান করেছেন, অতঃপর ওকে পথ দেখিয়েছেন। (২০:৫০) সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি সৎ ও ভাগ্যবান তার কাছে ভাগ্যবানদের আমল কঠিন অনুভূত হয় না। আর যে ব্যক্তি পাপিষ্ঠ ও হতভাগ্য তার কাছে হতভাগ্যদের আমল সহজ হয়ে যায়।” এ জন্যেই আল্লাহ পাক বলেনঃ ‘এক দলকে আল্লাহ সৎপথে পরিচালিত করেছেন এবং অপর দলের জন্যে সংগত কারণেই ভ্রান্তি নির্ধারিত হয়েছে। অতঃপর আল্লাহ পাক এর কারণ বর্ণনায় বলেছেনঃ তারা আল্লাহকে ছেড়ে শয়তানকে অভিভাবক ও বন্ধু বানিয়ে নিয়েছিল। এটা ঐ লোকদের ভুলের উপর স্পষ্ট দলীল যারা ধারণা করে থাকে যে, আল্লাহ কাউকেও নাফরমানীর কারণে বা ভুল বিশ্বাসের কারণে শাস্তি দিবেন না, যখন তার আমল সঠিক ও বিশুদ্ধ হওয়ার উপর তার পূর্ণ বিশ্বাস থাকবে। তবে যদি কেউ জ্ঞান ও বিশ্বাস থাকা সত্ত্বেও হঠকারিতা করে না মানে তাহলে তাকে শাস্তি দেয়া হবে। তাদের এ ধারণা ঠিক নয়। কেননা, যদি তাদের এ ধারণা ঠিক হয় তবে সেই পথভ্রষ্ট ব্যক্তি যে হিদায়াতের উপর আছে বলে বিশ্বাস রাখে এবং সেই ব্যক্তি, যে প্রকৃতপক্ষে ভ্রান্ত পথের উপর নেই, বরং হিদায়াতের উপর রয়েছে, এ দু’জনের মধ্যে কোনই পার্থক্য থাকে না। অথচ আল্লাহ তাআলা বলে দিচ্ছেন যে, এই দু’ব্যক্তির মধ্যে অবশ্যই পার্থক্য রয়েছে।
তাফসিরে তাবারি লোড হচ্ছে...
তাফসিরে কুরতুবি লোড হচ্ছে...
তাফসিরে বাগাবি লোড হচ্ছে...
তাফসিরে সা'দি লোড হচ্ছে...
তাফসিরে জাকারিয়া লোড হচ্ছে...
আহসানুল বায়ান লোড হচ্ছে...
ফাতহুল মাজীদ লোড হচ্ছে...