وَاذْكُرْ فِي الْكِتَابِ إِسْمَاعِيلَ إِنَّهُ كَانَ صَادِقَ الْوَعْدِ وَكَانَ رَسُولًا نَبِيًّا ﴿٥٤﴾
এ কিতাবে উল্লেখিত ইসমাঈলের কথা স্মরণ কর, সে ছিল ওয়া‘দা রক্ষায় (দৃঢ়) সত্যবাদী, আর ছিল একজন রসূল ও নবী। ( সুরাঃ মারইয়াম আয়াতঃ 54 )
৫৪-৫৫ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে আল্লাহ তাআলা ইসমাঈল ইবনু ইবরাহীমের (আঃ) প্রশংসামূলক বর্ণনা দিচ্ছেন। তিনি সারা হিজাযের পিতা। তিনি যে নযর বা মানত মানতেন এবং যে ইবাদত করার ইচ্ছা করতেন তা তিনি পুরো করতেন। প্রত্যেক হক তিনি আদায় করতেন। একটি লোককে তিনি একদা ওয়াদা দিয়ে বলেনঃ “আমি তোমার সাথে অমুক জায়গায় সাক্ষাৎ করবো। তুমি সেখানে পৌঁছবে।” ওয়াদা মুতাবেক হযরত ইসমাঈল (আঃ) সেখানে হাজির হন। কিন্তু ঐ লোকটি আসে নাই। তার অপেক্ষায় তিনি সেখানে অবস্থান করতে থাকেন। শেষ পর্যন্ত পূর্ণ একদিন ও একরাত অতিবাহিত হয়ে যায়। পরে লোকটির ঐ কথা স্মরণ হলে সে সেখানে এসে দেখে যে, তিনি তার জন্যে অপেক্ষা করতে রয়েছেন। সে জিজ্ঞেস করেঃ “আপনি কি কাল থেকেই। এখানে অবস্থান করছেন? উত্তরে তিনি বলেনঃ “যখন ওয়াদা ছিল তখন অবস্থান না করে কি পারি?" লোকটি তখন ওর পেশ করে বলেঃ “জনাব ক্ষমা করবেন, আমি একেবারে ভুলেই গিয়েছিলাম।” সুফিয়ান সাওরী (রঃ) বলেন যে, তার অপেক্ষায় সেখানে তার পূর্ণ একটি বছর কেটে যায়। ইবনু শূযিব (রঃ) বলেন যে, সেখানে তিনি বাসস্থান বানিয়ে নিয়ে ছিলেন। আবুল হামসা' (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “নুবওয়াতের পূর্বে আমি রাসূলুল্লাহর (সঃ) সাথে কিছু বাণিজ্যিক লেন দেন করেছিলাম। আমি চলে যাই এবং তাঁকে বলে যাইঃ আপনি এখানেই অবস্থান করুন, আমি এখনই ফিরে আসছি। তারপর আমি সম্পূর্ণরূপে বেখেয়াল হয়ে যাই। এরপর ঐদিন কেটে যায় এবং ঐ রাতও কেটে যায়। তৃতীয় দিনে আমার ঐকথা স্মরণ হলো। আমি গিয়ে দেখি যে তিনি সেখানেই অবস্থান করছেন। তিনি আমাকে দেখে শুধু এইটুকু বলেনঃ “তুমি আমাকে কষ্টে ফেলে দিয়েছে। আমি তিন দিন থেকে এখানেই তোমার জন্যে অপেক্ষা করছি।" (এটা ইমাম আবু দাউদ (রঃ) তাঁর সুনান গ্রন্থে এবং আবু বকর মুহাম্মদ ইবনু জাফর খারায়েতী (রঃ) তার মাকারিমূল আখলাক’ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন) এটাও বলা হয়েছে যে, এটা তাঁর ঐ ওয়াদার বর্ণনা যা তিনি তাঁর যবাহর সময় তাঁর পিতার সাথে করেছিলেন। তিনি বলেছিলেনঃ “আব্বা! আপনি আমাকে ধৈর্যশীল পাবেন।” সত্যিই তিনি তার ঐ ওয়াদা পুরো করেছিলেন এবং ধৈর্য ও সহনশীলতার সাথে কাজ করেছিলেন। ওয়াদা পুরো করা একটা ভাল কাজ এবং ওয়াদার খেলাফ করা অত্যন্ত খারাপ কাজ। কুরআন কারীমে ঘোষিত হচ্ছেঃ “হে মু'মিনগণ! এইরূপ কথা কেন বলছো যা (নিজেরা) কর না? আল্লাহর নিকট এটা অত্যন্ত অসন্তুষ্টির কারণ যে, এইরূপ কথা বলা যা (নিজেরা) কর না।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “মুনাফিকের লক্ষণ তিনটি। যখন কথা বলে মিথ্যা বলে, ওয়াদা করলে তা ভঙ্গ করে এবং কিছু আমানত রাখা হলে খিয়ানত করে। এসব আচরণ হতে মু'মিন মুক্ত ও পবিত্র হয়ে থাকে। ওয়াদার এই সত্যতাই হযরত ইসমাঈলের (আঃ) মধ্যে ছিল এবং এই পবিত্র বিশেষণ হযরত মুহাম্মদ মুস্তফার (সঃ) মধ্যেও ছিল। কারো সাথে তিনি কখনো ওয়াদা খেলাফ করেননি। একদা তিনি আবুল আস ইবনু রাবীর (রাঃ)। প্রশংসা করতে গিয়ে বলেনঃ “সে আমার সাথে যে কথা বলেছে সত্য বলেছে এবং আমার সাথে যে ওয়াদা করেছে তা পূর্ণ করেছে।" হযরত সিদ্দীকে আকবর (রাঃ) খিলাফতে নববীর (সঃ) উপর কদম রেখেই ঘোষণা করেনঃ “নবী (সঃ) কারো সাথে কোন ওয়াদা করে থাকলে আমি পুরো করার জন্যে প্রস্তুত আছি। আর রাসূলুল্লাহর (সঃ) উপর কারো কোন ঋণ থাকলে আমি তা আদায় করার জন্যে মওজুদ আছি।" তখন হযরত জাবির ইবনু আবদিল্লাহ (রাঃ) আর্য করেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার সাথে ওয়াদা করেছিলেন যে, বাহরাইন হতে মাল আসলে তিনি আমাকে তিন লপ ভরে মাল দিবেন।” হযরত সিদ্দীকে আকবরের (রাঃ) নিকট বাাইন হতে যখন মাল আসলো তখন হযরত জাবিরকে ডেকে পাঠিয়ে বলেনঃ “হাতের দু’তালু ভরে মাল উঠিয়ে নাও।” এভাবে উঠিয়ে নিলে দেখা যায় যে, পাচশ দিরহাম (রৌপ্য মুদ্রা) উঠিয়ে এসেছে। তখন হযরত আবু বকর (রাঃ) তাকে বলেনঃ “তিন লপের পনের শ’ দিরহাম নিয়ে নাও।” অতঃপর আল্লাহ তাআলা বলেছেন যে, হযরত ইসমাঈল (আঃ) রাসূল ও নবী ছিলেন। অথচ হযরত ইসহাকের (আঃ) শুধু নবী হওয়ার কথা বলেছেন। এর দ্বারা ভাই-এর উপর হযরত ইসমাঈলের (আঃ) ফযীলত প্রমাণিত হচ্ছে। সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ইবরাহীমের (আঃ) সন্তানদের মধ্যে আল্লাহ তাআলা হযরত ইসমাঈলকে (আঃ) পছন্দ করেছেন। তারপর তার আরো প্রশংসা করা হচ্ছে যে, তিনি আল্লাহ তাআলার আনুগত্যের উপর ধৈর্যশীল ছিলেন এবং নিজের পরিবারের লোকদেরকেও এই হুকুমই দিতে থাকতেন। এই হুকুমই আল্লাহ তাআলা স্বীয় নবীকেও (সঃ) দিয়েছেন। তিনি বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তুমি তোমার পরিবারবর্গকে নামাযের হুকুম করতে থাকো এবং নিজেও ওর উপর দৃঢ়তার সাথে কাজ কারো। (২০:১৩২) অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে মুমিনগণ! তোমরা নিজেদেরকে ও তোমাদের পরিজনদেরকে সেই অগ্নি হতে রক্ষা করো যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর, যাতে কঠোর স্বভাব, শক্তিশালী ফেরেশতারা (নিয়োজিত রয়েছে, তারা কোন বিষয়ে আল্লাহর নাফরমানী করে না, যা তাদেরকে আদেশ করেন, আর তাদেরকে যা আদেশ করা হয় তারা (তৎক্ষণাৎ) তা পালন করে। (৬৬:৬) সুতরাং মু'মিনদেরকে নির্দেশ দেয়া হচ্ছে যে, তারা যেন নিজেদের পরিবারবর্গকে ও আত্মীয় স্বজনকে ভাল কাজের আদেশ করে ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে। তারা যেন তাদেরকে শিক্ষাহীনভাবে ছেড়ে না দেয়, অন্যথায় তারা জাহান্নামের গ্রাস হয়ে যাবে অর্থাৎ জাহান্নাম তাদেরকে গ্রাস করে ফেলবে। হাদীসে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ঐ ব্যক্তির উপর আল্লাহ করুণা বর্ষণ করুন, যে রাত্রে (ঘুম থেকে জেগে) ওঠে এবং (তাহাজ্জুদের) নামায পড়ে। অতঃপর তার স্ত্রীকে জাগিয়ে তোলে এবং সে উঠতে অস্বীকার করলে তার মুখে পানি ছিটিয়ে দেয়। আল্লাহ ঐ স্ত্রী লোকের উপর দয়া করুন, যে রাত্রে (ঘুম হতে জেগে) ওঠে এবং (তাহাজ্জুদের) নামায পড়ে। অতঃপর তার স্বামীকে জাগ্রত করে এবং সে উঠতে অস্বীকার করলে তার চেহারায় পানি ছিটিয়ে দেয়।” (এ হাদীসটি ইমাম আবু দাউদ (রঃ) ও ইমাম ইবনু মাজাহ (রঃ) তাখরীজ করেছেন) হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) ও হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেন, “যখন মানুষ রাত্রে ঘুম হতে জেগে ওঠে এবং তার স্ত্রীকেও জাগ্রত করে, অতঃপর তারা দু'রাকাআত নামায পড়ে নেয়, তখন আল্লাহর যিক্রকারী ও যিকরকারিণী পুরুষ ও মহিলাদের মধ্যে তাদের নাম লিখে নেয়া হয়।" (এহাদীসটি ইমাম আবু দাউদ (রঃ), ইমাম নাসায়ী (রঃ) ও ইমাম ইবনু মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
তাফসিরে তাবারি লোড হচ্ছে...
তাফসিরে কুরতুবি লোড হচ্ছে...
তাফসিরে বাগাবি লোড হচ্ছে...
তাফসিরে সা'দি লোড হচ্ছে...
তাফসিরে জাকারিয়া লোড হচ্ছে...
আহসানুল বায়ান লোড হচ্ছে...
ফাতহুল মাজীদ লোড হচ্ছে...